শব্দদূষণ কাকে বলে? এর কারন ও নিয়ন্ত্রণের উপায়গুলি সংক্ষেপে আলোচনা করো ।

উত্তরঃ শব্দদূষণ বলতে মানুষের বা কোনো প্রাণীর শ্রুতিসীমা অতিক্রমকারী কোনো শব্দ সৃষ্টির কারণে শ্রবণশক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনাকে বোঝায়। যানজট, কলকারখানা থেকে দূষণ সৃষ্টিকারী এরকম তীব্র শব্দের উৎপত্তি হয়। মানুষ সাধারণত ২০-২০,০০০ হার্জের কম বা বেশি শব্দ শুনতে পায় না।
শব্দদূষণ কাকে বলে এর কারন লেখো ও শব্দ দূষণ নিয়ন্ত্রণের উপায়গুলি সংক্ষেপে আলোচনা করো ।

কোনাে বস্তু যদি প্রতি সেকেন্ডে 20 বারের বেশি কিংবা 20,000 বারের কম কম্পিত হয় তাহলে একপ্রকারের শব্দ সৃষ্টি হয় । বস্তুর কম্পনের ফলে পরিবৃত বাতাসের যে পর্যায়ক্রমিক ঘনীভবন ( compression ) ও তনুভবন ( refraction ) ঘটে , তা চতুর্দিকে বিস্তৃত হলে যে তরঙ্গ গতির ( wave motion ) সৃষ্টি হয় , তাকেই শব্দ তরঙ্গ ( sound wave ) বলে । এই শব্দ তরঙ্গ কানের পর্দাতে আঘাত করলে আমাদের সেই শব্দের শ্রবণানুভূতি হয় । প্রত্যেক শব্দ অন্য শব্দ থেকে তিনটি ব্যাপারে পৃথক হয়ে থাকে , যথা — শব্দের তীব্রতা ( loudness ) ( কর্কশ বা কোমল ) , তীক্ষ্ণতা ( pitch ) ( উঁচু বা নীচু ) এবং স্বর ( note ) ( শব্দের বিশিষ্টতা ) । শব্দের তীব্রতা শব্দ তরঙ্গের দৈর্ঘ্যের ( বিস্তারের ) ( amplitude ) উপর নির্ভর করে । শব্দের তীক্ষ্ণতা শব্দতরঙ্গের দুতির উপর নির্ভর করে । 
শব্দ দূষণের কারণ শব্দ দূষণের বিভিন্ন কারণ হতে পারে । সব শব্দই শব্দ কিন্তু শব্দের পার্থক্য পরিবেশের পার্থক্যের জন্য আলাদা হয়ে থাকে , ফলে ব্যক্তির উপর তার প্রভাবও পৃথক হয় । 
শিল্পাঞ্চলের শব্দ দূষণ : কলকারখানা সংলগ্ন স্থানে যাদের বাস তারা সাধারণত কারখানায় কাজ চলাকালীন অবস্থায় ব্যক্তির শ্রবণানুভূতি যতটা থাকে কয়েক বছর কাজ করবার পর তা কমে যায় । তখন জোরে কথা না বললে সেই ব্যক্তি শুনতে পায় না । একেই ‘ আংশিক বধিরতা’ বলে । কারখানায় কর্মরত অবস্থায় মেশিনের শব্দ ব্যক্তির শ্রুতি স্নায়ুর সংবেদনশীলতা আংশিক নষ্ট করে দেয় । কলকারখানার শব্দ মানুষের মস্তিষ্কেরও ক্ষতি করে ।   
শহরের পরিবেশ শব্দ দূষণ : শহরে যাদের বাস বড়াে রাস্তার উপরে , তাদের শ্রুতিস্নায়ু দিবারাত্র বাস , ট্রাম এবং বিভিন্ন যানবাহনের বিকট শব্দের প্রভাবে ক্রমশ পরিবর্তিত হয়ে থাকে । এই সব ব্যক্তি প্রথম প্রথম স্বাভাবিক থাকে , কিন্তু ক্রমশ তাদের নানারকমের স্নায়বিক ব্যাধি দেখা দেয় — এইসব রােগের মধ্যে অনিদ্রা , খিদে না হওয়া , খিটখিটে মেজাজ , হৃৎপিণ্ডের দুর্বলতাজনিত রােগ অন্যতম । বড়াে রাস্তার ধারে বসবাসকারী ব্যক্তির সঙ্গে গলিতে বসবাসকারী ব্যক্তির তুলনামূলক পরীক্ষায় এইসব রােগ ধরা পড়ে ।   শহরের বাস ড্রাইভারদের মধ্যে ( কর্কশ শব্দে গাড়ির হর্ন বাজাবার জন্য ) আংশিক বধিরতা রােগ এবং নানাবিধ স্নায়বিক রােগের প্রাদুর্ভাব দেখা যায় । 
রেডিও লাউড স্পিকার প্রভৃতি দোকানের কর্মচারীদের মধ্যেও নানাবিধ স্নায়বিক দৌর্বল্য দেখা যায় ।   প্রেসের মেশিন চালকদের একঘেয়ে ঘটাংঘটাং শব্দ তাদের স্নায়বিক উত্তেজনা , উচ্চ রক্তচাপ , বিষণ্ণতা , অনিদ্রা , মাথাধরা প্রভৃতি রােগের কারণ ।   
স্টেশনের পরিবেশে শব্দ দূষণ : শহরের বড়াে বড়াে রেল স্টেশনের কোলাহলমুখর স্থানে কাজ করে এমন ব্যক্তির স্বভাবের পরিবর্তন ঘটে । এরা উচ্চস্বরে  কথাবার্তা বলতে অভ্যস্ত হয় , কারণ নিজেরা উচ্চস্বর ছাড়া কোনাে কিছুই শুনতে পায় না ।  
বিমানবন্দরের শব্দ দূষণ : বিমানবন্দরের কাছ যাদের বাস তারা বিমানের ওঠা নামাকালীন বিমানের বিকট শব্দের সঙ্গে ক্রমে পরিচিত হয়ে উঠে । বিমান ওঠা নামাকালীন বিমানবন্দরের সংলগ্ন বাড়িগুলিতে যে কম্পনের সৃষ্টি হয় তা বসবাসকারী ব্যক্তির দৈনন্দিন জীবনকে প্রভাবিত করে । এইসব স্থানের ব্যক্তিদের নানাবিধ স্নায়বিক রােগ দেখা দেয় । অনেকক্ষেত্রে এটি গর্ভবতী স্ত্রীলােকদের গর্ভস্থ সন্তানের মানসিকতাকে প্রভাবিত করে ।  
শেয়ার বাজারের শব্দ দূষণ : শহরের শেয়ার বাজারে যে সব ব্যবসায়ী সর্বদা থাকেন তাদের সর্বদাই উচ্চকণ্ঠে কথাবার্তা বলতে হয় , ফলে শেয়ার বাজারের পরিবেশ সর্বদাই কোলাহলপূর্ণ থাকে । দীর্ঘদিন এরূপ পরিবেশে থাকার ফলে এরা পরিবেশের সঙ্গে অভিযােজিত হয়ে পড়ে ; তার ফলে এদের মানসিক স্বাভাবিকতা নষ্ট হয়ে যায় । এরা স্বরযন্ত্রের বিভিন্ন রােগ , স্নায়বিক বৈকল্য , বিমর্ষতা , অনিদ্রা  প্রভৃতি রােগের শিকার হয়ে পড়ে । 
শব্দ দূষণের ফলাফল শব্দের তীব্রতা ( intensity ) মাপার একককে ডেসিবেল ( decibel ) বলে । বিজ্ঞানী গ্রাহাম বেল -এর নামানুসারে 0.1 বেলকে ( bel ) 1 ডেসিবেল ( decibel , dB ) বলা হয় ।   ডেসিবেল ( dB ) = 10 log ✖ ( নির্ণীত শব্দের তীব্রতা ( intensity of sound ) ➗ প্রমাণ শব্দের তীব্রতা ( intensity of standard sound )
0 থেকে 140 ডেসিবেল পর্যন্ত শব্দের যে কোন মাত্রাই কানের ক্ষতি করতে পারে । এর মধ্যে 70-140 dB সব থেকে বেশি ক্ষতিকর । পশ্চিমবঙ্গের হাইকোর্টের রায় অনুসারে মানুষের শ্রুতিগ্রাহক শব্দের সর্বোচ্চ মান 65 dB ধরা হয়েছে । শব্দদূষণের ফলে মানুষের 一  
( i ) কর্ণপটহ ছিড়ে যেতে পারে , 
( ii ) সম্পূর্ণ বধির হতে পারে , 
( iii ) হৃদযন্ত্রের গােলযােগ হতে পারে । অস্বাভাবিক হৃৎছন্দ , হৃৎপিণ্ডের গতি হ্রাস পাওয়া প্রভৃতি ঘটনা দেখা যায় । 
( iv ) শ্বসন হার হ্রাস পায় । 
( v ) লালাগ্রন্থি এবং পাকস্থলির ক্ষরণ হ্রাস পায় ।   
শব্দ দূষণ নিয়ন্ত্রণের উপায় শব্দ দূষণ নিয়ন্ত্রণের জন্য নিম্নলিখিত উপায় অবলম্বন করতে হবে 一  
( i ) কলকারখানায় শব্দ নিরােধক ব্যবস্থা গ্রহণ করা ।   
( ii ) কলকারখানার সন্নিকটে বসতি স্থাপন বন্ধ করা এবং ঘন বসতিপূর্ণ স্থানের নিকটে কলকারখানা স্থাপন নিষিদ্ধ করা ।   
( iii ) শহরে গাড়ি যাতে অযথা হন না বাজায় তা আইন দ্বারা নিষিদ্ধ করা ।   
( iv ) শহরের যানবাহনের নির্দিষ্ট পথে যাতায়াতকালীন যথাসম্ভব শব্দ নিয়ন্ত্রণ করা ।   
( v ) শহরে যাতে উচ্চস্বরে রেডিও কিংবা মাইক বাজানাে বন্ধ হয় তার জন্য আইন করা । 
( vi ) বিমানবন্দরের নিকটে যাতে বসতি স্থাপন না হয় তার প্রতি লক্ষ রাখা ।   
( vii ) প্রতিটি নাগরিক যাতে তাদের কর্তব্য ও দায়িত্ব সম্বন্ধে সচেতন থাকে সেরূপ শিক্ষা প্রদান করা ।   
( viii ) রেডিও , টেলিভিশন , সংবাদপত্র প্রভৃতি প্রচার মাধ্যমের সহায়তায় শব্দদূষণের মারাত্মক কুফল সম্বন্ধে জনসাধারণকে সজাগ করে তােলা । এ বিষয়ে সরকার ও বেসরকারি সমাজকল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠানের মিলিত প্রয়াস কাম্য । 

Lob (Admin)

This site was launched on March 1, 2019. Today it is appreciated by millions of students. This site has changed a lot in the last two years and I have tried to do better every time.

Please Do Not Enter Any Span Link in The Comment Box

Previous Post Next Post

نموذج الاتصال