উত্তরঃ গদ্যসাহিত্যে বিদ্যাসাগরের অবদান: উনবিংশ শতাব্দীর বঙ্গভূমিতে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের আবির্ভাব (জন্ম ১৮২০, মৃত্যু ১৮৯১) আমাদের বিস্মিত করে। সমাজসংস্কার এবং শিক্ষাবিস্তারেই কেবল নয়, আমরা যখন তার বাংলা গদ্যচর্চার দিকে তাকাই, তখনও তাঁর অবদানের কথা ভেবে আমাদের বিস্ময়ের শেষ থাকে না। রামমােহন যদি বাংলা গদ্যে ব্যক্তিত্ব সঞ্চার করে থাকেন, তবে তাতে শিল্পগুণ সঞ্চার করেছেন বিদ্যাসাগর। বাংলা ভাষায় বিদ্যাসাগর যে-সমস্ত গ্রন্থ রচনা করেছেন সেগুলিকে প্রধানত পাঁচটি ভাগে ভাগ করা যায়—
১) অনুবাদমূলক রচনা
২) মৌলিক রচনা
৩) পাঠ্যপুস্তক শ্রেণির রচনা
৪) সংস্কারমূলক রচনা
৫) ব্যঙ্গ রচনা।
বিদ্যাসাগরের অনুবাদমূলক রচনাগুলি মূলত দুই শ্রেণির—সংস্কৃত থেকে অনুবাদ এবং হিন্দি ও ইংরেজি থেকে অনুবাদ। বিদ্যাসাগরের অনুবাদমূলক রচনাগুলি নিছক ভাষান্তর নয়, এগুলির মধ্যে তার নিজস্ব সৃজনধর্মী শিল্পীসত্তার পরিচয় পাওয়া যায়। শকুন্তলা', সীতার বনবাস’ প্রভৃতি গ্রন্থ সংস্কৃত গ্রন্থ অবলম্বনে রচিত; ইংরেজি গ্রন্থ অবলম্বনে তিনি রচনা করেন বাঙ্গালার ইতিহাস’, ‘বােপােদয়’, ‘কথামালা’, ‘ভ্রান্তিবিলাস’ প্রভৃতি; আর হিন্দি ‘বেতালপচ্চীসী’ অবলম্বনে রচনা করেন ‘বেতাল পঞ্চবিংশতি’। বিদ্যাসাগরের মৌলিক রচনাগুলির মধ্যে আছে ‘সংস্কৃত ভাষা ও সংস্কৃত সাহিত্যশাস্ত্র বিষয়ক প্রস্তাব’, ‘প্রভাবতী সম্ভাষণ’, ‘বিদ্যাসাগর চরিত’প্রভৃতি। বর্ণপরিচয়’, ব্যাকরণ কৌমুদী', শব্দমঞ্জরী’ প্রভৃতি তার উল্লেখযােগ্য পাঠ্যপুস্তক শ্রেণির রচনা। বিধবাবিবাহ প্রচলিত হওয়া উচিত কিনা এতদ্বিষয়ক প্রস্তাব’, বহুবিবাহ রহিত হওয়া উচিত কিনা এতদ্বিষয়ক বিচার’ প্রভৃতি তাঁর সংস্কারমূলক রচনা। তাঁর ব্যঙ্গমূলক রচনার মধ্যে পড়ে বেনামে প্রকাশিত ‘অতি অল্প হইল’, ‘আবার অতি অল্প হইল’, ‘ব্রজবিলাস’ প্রভৃতি। এই রচনাগুলি তিনি ‘কস্যচিৎ উপযুক্ত ভাইপােস্য’ এবং কিস্যচিৎ উপযুক্ত সহচরস্য’ ছদ্মনামে লেখেন। বিদ্যাসাগরের সমস্ত রচনাকে বিশ্লেষণ করলে চারপ্রকার বৈশিষ্ট্য লক্ষ করা যায়—কোথাও তিনি ভাষাশিল্পের প্রতি মনােযােগী, কোথাও ভাষাশিক্ষার প্রতি যত্নবান, আবার কোথাও সুতীক্ষ যুক্তি দিয়ে প্রাচীন সংস্কারকে আঘাত করতে উদ্যত কিংবা বিদ্রুপের কশাঘাতে ভণ্ডামি ও মূঢ়তার অবসান ঘটাতে সচেষ্ট।
বিদ্যাসাগর কমা ইত্যাদি যতি চিহ্নের ব্যবহার করে বাংলা গদ্যে শৃঙ্খলা নিয়ে আসেন; উপবাক্যের ব্যবহার করে বাংলা গদ্যের অন্বয়ের ধারণাকেই পালটে দেন তিনি। রবীন্দ্রনাথের কথায়—“গদ্যের পদগুলির মধ্যে একটা ধ্বনিসামঞ্জস্য স্থাপন করিয়া, তাহার গতির মধ্যে একটি অনতিলক্ষ্য ছন্দঃস্রোত রক্ষা করিয়া, সৌম্য এবং সরল শব্দগুলি নির্বাচন করিয়া বিদ্যাসাগর বাংলা গদ্যকে সৌন্দর্য ও পরিপূর্ণতা দান করিয়াছেন।”
Tags
Bengali
