◆ দ্বিতীয় অংশ :
● মেহেরগড় সভ্যতার অধিবাসীদের জীবনযাত্রার বিভিন্ন পর্ব : নানান পুরাতাত্ত্বিক গবেষণার মাধ্যমে জানা গিয়েছে যে, মােট সাতটি পর্বে মেহেরগড় সভ্যতার ক্রমবিকাশ ঘটেছিল, এর মধ্যে প্রথম তিনটি পর্ব নতুন প্রস্তর যুগের সমসাময়িক কালের বলে মনে করা হয়। এই সাতটি পর্ব থেকে মেহেরগড় সভ্যতার অধিবাসীদের ভ্রাম্যমান পশুপালকের জীবন থেকে যাত্রা করে কৃষিভিত্তিক সমাজ জীবনে উত্তরণের ইতিহাসের একটি সুস্পষ্ট ছবি পাওয়া যায়। |
◆ প্রথম পর্ব : মেহেরগড় সভ্যতার প্রথম পর্বের সময়কালটি খ্রিস্টপূর্ব ৭,০০০ অব্দ থেকে খ্রিস্টপূর্ব ৫,০০০ অব্দ পর্যন্ত পরিব্যাপ্ত ছিল।
প্রথম পর্বে মেহেরগড়ের সভ্যতার অধিবাসীরা পাথরের অস্ত্রের সাহায্যে পশুশিকার করে জীবনধারণ করত।
১] কৃষি ও পশুপালন : প্রথম দিকে মেহেরগড় সভ্যতার মানুষ খাদ্য সংগ্রহকারী’হলেও পরবর্তীকালে খাদ্য উৎপাদকে পরিণত হয়। এই অঞ্চলে অস্থায়ীভাবে যাযাবর জীবনযাপনকারী শিকারি ও পশুপালকেরা পরবর্তীকালে এখানে স্থায়ী আবাসস্থল গড়ে তােলে এবং ধীরে ধীরে কৃষিকেন্দ্রিক জীবন যাত্রার সূত্রপাত হয়। গম, যব ও বার্লি ছিল এযুগের প্রধান খাদ্যশস্য।
২] বাসস্থান ও শিল্প : প্রথম দিকে এখানে রােদে শুকানাে মাটির ইট দিয়ে বিচ্ছিন্নভাবে ঘরবাড়ি তৈরি করা হত। বেশিরভাগ সময়ে এইসব বাড়িতে দুই বা ততােধিক ঘর থাকত, অনেক সময় এরা জিনিসপত্র রাখার গুদাম হিসাবেও ব্যবহৃত হত। এই যুগে দুই সারি বাড়ির মধ্যে গলিপথরাখা হত। প্রথম দিকে মেহেরগড় সভ্যতার মানুষদের মৃৎশিল্প সম্পর্কে কোনাে ধারণা ছিল না। তবে ৬,০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ থেকে এখানকার মানুষ মাটির নানান রকম নিত্যপ্রয়ােজনীয় জিনিস তৈরি করবার কৌশল শিখে নেয়।
◆ দ্বিতীয় পর্ব - মেহেরগড় সভ্যতার দ্বিতীয় পর্বের সময়কাল খ্রিস্টপূর্ব ৫,০০০ অব্দ থেকে ৪,০০০ অব্দ পর্যন্ত পরিব্যাপ্ত ছিল।
১| কৃষি : প্রথম পর্বের ধারাবাহিকতার সঙ্গে এই পর্বের মানুষ কার্পাস বা তুলা চাষ করতে শেখে। এই পর্বে পাওয়া প্রচুর কার্পাস বীজ থেকে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছানাে সম্ভব হয়েছে। এই পর্বের মানুষেরা মােটামুটি কাজ চালানাের উপযােগী জলসেচ ব্যবস্থা গড়ে তুলেছিলেন।
২] শিল্প : এই পর্বে কুমােরের চাকের সাহায্যে মাটির পাত্র তৈরির প্রচলন হয়। এইসব পাত্রগুলাে নানান রং-এ রং করা হত। এই পর্বে তামার তৈরি কয়েক রকম অলংকার পাওয়া গিয়েছে।
৩| বাণিজ্য : সমুদ্র থেকে বহুদূরে অবস্থিত এই অঞ্চলে সামুদ্রিক শঙ্খ ও নানান ধরনের পাথরের নিদর্শন পাওয়া গিয়েছে, যা এখানকার অধিবাসীদের বহির্বাণিজ্যের ইঙ্গিত বহন করে।
◆ তৃতীয় পর্ব - মেহেরগড় সভ্যতার তৃতীয় পর্বের সময়কাল ছিল খ্রিস্টপূর্ব ৪,০০০ থেকে ৩,০০০ অব্দের মধ্যে পরিব্যপ্ত।
১] কৃষি, শিল্প ও বাণিজ্য : এই পর্বে গম, যব ও কার্পাস ছাড়াও আরও নতুন নতুন ফসলের চাষ এযুগের কৃষিকর্মে বিশেষ অগ্রগতির সাক্ষ্য দেয়।
এই সময়ে তৃতীয় পর্বে পাওয়া অনেকগুলি তামা গলানাের উপযােগী পােড়া মাটির পাত্র বা মুচি তাম্র শিল্পে এযুগের মানুষের অগ্রগতির সাক্ষ্য বহন করে। এছাড়া চাকে তৈরি এবং চুল্লির আগুনে পােড়ানাে নানা রং-এর মৃৎপাত্রের অস্তিত্ব এই যুগের মৃৎশিল্পে আরও উন্নতির সাক্ষ্য বহন করে। এছাড়া এই কালসীমায় মেহেরগড় সভ্যতায় বহির্বাণিজ্যের ক্রমবিস্তার ঘটে।
● চতুর্থ পর্ব থেকে সপ্তম পর্ব : এই সময়কালে মেহেরগড় সভ্যতার বিকাশের মাত্রা আরও বৃদ্ধি পায়। অনুমান করা হয় যে এই সভ্যতার সঙ্গে ইরান, আফগানিস্তান ও তুর্কমেনিস্তানের সম্পর্ক ছিল। তবে ঐতিহাসিক সেরিন রত্নাগার মনে করেন যে, এখানকার অধিবাসীরা সুতিবয়ন বিদ্যা সম্পর্কে ওয়াকিবহাল ছিল না। অন্যদিকে, ঐতিহাসিক ডক্টর ইরফান হাবিব এখানে শ্রেণিবিভক্ত সমাজব্যবস্থার অস্তিত্ব লক্ষ করেছেন। মেহেরগড়ে প্রাপ্ত নানান জিনিসের মধ্যে হার, কানপাশা প্রভৃতি অলংকার, পাথর ও ধাতুর তৈরি নানান বাসনপত্র, পােড়ামাটির মূর্তি ও সিলমােহর ছিল উল্লেখযােগ্য।
বস্তৃতপক্ষে এই সভ্যতা ছিল হরপ্পা সংস্কৃতির পথপ্রদর্শক।
Tags
History

