উত্তরঃ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে আচরণবাদী দৃষ্টিভঙ্গির উদ্ভব ঘটে। এই দৃষ্টিভঙ্গি রাজনৈতিক ও সামাজিক জীব হিসেবে মানুষের আচরণ এবং কোন্ পরিবেশ-পরিস্থিতিতে সেই আচরণ সংঘটিত হয়েছে তার ওপর গুরুত্ব আরােপ করে। গ্রাহাম ওয়ালাস, আর্থার বেন্টলি, ডেভিড ইস্টন প্রমুখ এই দৃষ্টিভঙ্গির অন্যতম তাত্ত্বিক।
গ্রাহাম ওয়ালাস একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক প্রেক্ষিতে তথ্য ও প্রমাণ সাপেক্ষে মানুষের রাজনৈতিক আচরণ পর্যালােচনার কথা বলেছেন। আর্থার বেন্টলি রাজনৈতিক বিচার-বিশ্লেষণের জন্য ব্যক্তির চেয়ে দল, জনমত, নির্বাচনি আচরণ, স্বার্থগগাষ্ঠী প্রভৃতি গােষ্ঠীসমূহের কার্যাবলির ওপর বেশি জোর দিয়েছেন। আচরণবাদে ব্যক্তি ও গােষ্ঠীসমূহের আচার-আচরণ পর্যালােচনার মাধ্যমে রাজনৈতিক ঘটনার সুশৃঙ্খল, অভিজ্ঞতামূলক ও কার্যকারণ সংক্রান্ত ব্যাখ্যা করা হয়। আচরণবাদীগণ রাষ্ট্রবিজ্ঞানের আলােচনায় ভৌতবিজ্ঞানের কলাকৌশল প্রয়ােগের মাধ্যমে অভিজ্ঞতাবাদী তত্ত্ব নির্মাণ করেন। আচরণবাদে নৈতিকতা বা উচিত-অনুচিতের আলােচনা থাকে না। আচরণবাদীরা মূল্যবোেধ নিরপেক্ষ ঘটনার ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করেন।
■ আচরণবাদী দৃষ্টিভঙ্গির বৈশিষ্ট্য -- আচরণবাদী দৃষ্টিভঙ্গির কিছু বৈশিষ্ট্য লক্ষ করা যায়। এগুলি হল ----
1) আচরণবাদে অভিজ্ঞতাবাদী দৃষ্টিকোণ থেকে মূল্যবােধ নিরপেক্ষভাবে রাজনৈতিক বিষয়ের ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করা হয়।
2) আচরণবাদে রাজনৈতিক ঘটনা, প্রতিষ্ঠান, কাঠামাে, মতাদর্শের পরিবর্তে ব্যক্তি ও গােষ্ঠীর আচরণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
3) আচরণবাদে ভৌতবিজ্ঞানের কলাকৌশল প্রয়ােগ করা হয়। এমনকি বিজ্ঞানসম্মত আললাচনার উদ্দেশ্যে তথ্যসংগ্রহ, সমীক্ষা, সাক্ষাৎকার গ্রহণ, গণিত, পরিসংখ্যান, গণকযন্ত্র প্রভৃতির সাহায্য নেওয়া হয়।
4) আচরণবাদে রাজনৈতিক ব্যবস্থার আলােচনাকে নৈতিকতার প্রভাব মুক্ত করা হয় এবং নৃতত্ত্ব, মনস্তত্ত্ব, অর্থনীতি প্রভৃতির সাহায্য নেওয়া হয়।
5) আচরণবাদের সাধারণ সূত্রগুলিকে মানুষের আচরণের পরিপ্রেক্ষিতে পরীক্ষা করা হয় এবং যাচাই করা হয়।
6) আচরণবাদে তত্ত্ব গঠন ও গবেষণাকে পরিপূরক মনে করা হয়। কারণ অভিজ্ঞতালব্ধ গবেষণার ভিত্তিতে তত্ত্ব গঠন করা হয়। আবার তাত্ত্বিক বিষয়সমূহকে অভিজ্ঞতামূলক গবেষণার মধ্য দিয়ে যাচাই করা হয়।
◆ সমালােচনা
1) সমালােচকদের মতে, ব্যক্তির বা গােষ্ঠীর রাজনৈতিক আচরণকে কখনােই মূল্যমান নিরপেক্ষভাবে আলােচনা করা সম্ভব নয়। এক্ষেত্রে আচরণবাদী গবেষকের নিজস্ব ভাবনাচিন্তা, বিশেষ মতাদর্শের প্রতি পক্ষপাতিত্বের প্রভাবও লক্ষ করা যেতে পারে।
2) অনেক সমালােচক মনে করেন, আচরণবাদ রাজনৈতিক আলােচনায় নৃতত্ত্ব, মনস্তত্ত্ব, অর্থনীতি প্রভৃতি বিষয়ের সাহায্য নেওয়ায় রাষ্ট্রবিজ্ঞান শাস্ত্রটির স্বাতন্ত্র্য ক্ষুন্ন হয়েছে।
3) কোনাে কোনাে সমালােচক মনে করেন যে, রাজনৈতিক বিশ্লেষণের সব ক্ষেত্রে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি, পরিসংখ্যান, সমীক্ষা, তথ্যসংগ্রহ ইত্যাদি প্রয়ােগ করা যায় না। কারণ মানুষের রাজনৈতিক আদর্শ, অনুভূতি ইত্যাদিকে সম্পূর্ণভাবে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির মাধ্যমে বিচারবিশ্লেষণ করা সম্ভব নয়। আচরণবাদী তাত্ত্বিকগণ সাবেকি দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিষ্ঠানকেন্দ্রিক আলােচনার প্রবণতাকে বর্জন করতে চেয়েছিলেন। তবে তারা পরবর্তীকালে আচরণবাদী তত্ত্বের সীমাবদ্ধতাগুলি সম্পর্কে সচেতন হন এবং সেগুলি কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করেন। ডেভিড ইস্টন নিজেই স্বীকার করেছিলেন যে, আচরণবাদী তত্ত্বের অতিরিক্ত বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি নির্ভরতার ঝোক পরিহার করা প্রয়ােজন। ফলে নয়া-আচরণবাদী তত্ত্বের উদ্ভব হয়। নয়া-আচরণবাদে বাস্তব অবস্থা ও মূল্যবােধের মধ্যে সমন্বয়সাধনের কথা বলা হয়।
Tags
Political Science
