উত্তর : রাষ্ট্রবিজ্ঞানের সংজ্ঞা ও মূল আলােচ্য বিষয় সম্পর্কে রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের মধ্যে ব্যাপক মতপার্থক্য রয়েছে। বিভিন্ন সময় ও প্রেক্ষাপটের নিরিখে এবং দৃষ্টিভঙ্গিগত পার্থক্যের কারণে বিভিন্ন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী বিভিন্নভাবে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের সংজ্ঞা প্রদান করেছেন।
প্রথমেই রাষ্ট্রবিজ্ঞানের সনাতনী সংজ্ঞার কথা উল্লেখ করা দরকার। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের সনাতনী সংজ্ঞা হল আসলে রাষ্ট্রকেন্দ্রিক সংজ্ঞা। রাষ্ট্রকেন্দ্রিক সংজ্ঞায় দুই ধরনের বক্তব্যের সন্ধান পাওয়া যায়। নীচে দুই ধরনের বক্তব্যই আলােচনা করা হল
১) রাষ্ট্রবিজ্ঞান হল সেই শাস্ত্র যাতে রাষ্ট্রের উৎপত্তি, প্রকৃতি, উদ্দেশ্য, কার্যাবলি প্রভৃতি বিষয় আলােচিত হয়। এই মতের প্রবক্তা হলেন বুন্টলি (Bluntschli), গার্নার (Garner) গেটেল (Gettel) প্রমুখ। বুন্টলির মতে, রাষ্ট্রবিজ্ঞান হল রাষ্ট্রের বিজ্ঞান’ (Political Science is the Science of the State.)। তাঁর মতে, রাষ্ট্রবিজ্ঞান হল সেই শাস্ত্র যেখানে রাষ্ট্রের ভিত্তি, মৌলিক অবস্থা ও প্রকৃতি প্রভৃতি বিষয়ে আলােচনা করা হয়। বিভিন্ন রূপ ও বিবর্তন আলােচিত হয়। আর অধ্যাপক গার্নারের মতে, রাষ্ট্রবিজ্ঞান হচ্ছে রাষ্ট্র সংক্রান্ত সেই শাস্ত্র, যে শাস্ত্র রাষ্ট্রের উৎপত্তি, ক্রমবিকাশ, রাষ্ট্রের তত্ত্ব, প্রকৃতি ও রাষ্ট্রের কার্যাবলি নিয়ে আলােচনা করে। গার্নার বলেছেন, রাষ্ট্রবিজ্ঞানের শুরু ও শেষ রাষ্ট্রকে নিয়ে (Political Science begins and ends with the State.)।
২) সিলি (Seeley) রাষ্ট্রবিজ্ঞানকে সরকার সম্পর্কিত আলােচনার শাস্ত্র হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তার মতে, রাষ্ট্রবিজ্ঞানের একমাত্র আলােচ্য বিষয় সরকার। প্রকৃতপক্ষে রাষ্ট্র ও সরকার সম্পর্কিত আলােচনা নির্ভর সংজ্ঞা হল রাষ্ট্রকেন্দ্রিক সংজ্ঞারই অংশ। এই ধারণাই প্রতিফলিত হয়েছে পল জানে (Paul Janet)-র বক্তব্যে। তিনি বলেছেন, রাষ্ট্রবিজ্ঞান হল সমাজবিজ্ঞানের সেই অংশ, যা রাষ্ট্রের মৌলিক ভিত্তি এবং সরকারের নীতিসমূহ নিয়ে আলােচনা করে।
অন্যদিকে আধুনিককালের রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের প্রদত্ত আধুনিক সংজ্ঞাসমূহের কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। এই সংজ্ঞাগুলি হল রাষ্ট্রনিরপেক্ষ, কেননা এইসব সংজ্ঞায় রাষ্ট্রের পরিবর্তে গােষ্ঠীর কার্যকলাপ, প্রভাব ও ক্ষমতা ইত্যাদির নিরিখে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের সংজ্ঞা প্রদান করা হয়েছে। যেমন-ডেভিড টুম্যান (David Truman)-এর মতে সমাজে কার্যরত যাবতীয় গােষ্ঠীর কার্যকলাপ বিশ্লেষণ করে রাষ্ট্রবিজ্ঞান। ডব্লিউ. জে. এম. ম্যাকেঞ্জি (W. J. M. Mackenzie)-র মতে, রাজনৈতিক ক্রিয়াকলাপ সমাজের সর্বস্তরে দেখা যায়। রাজনৈতিক ক্রিয়াকলাপ কেবলমাত্র রাষ্ট্র ও রাষ্ট্রীয় সংগঠনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। হ্যারল্ড ডি. ল্যাসওয়েল (Harold D. Lasswell)-এর মতে, রাষ্ট্রবিজ্ঞান হল প্রভাব ও প্রভাবশালীর আলােচনা। ক্যাপলান (Kaplan)-এর মতে, রাষ্ট্রবিজ্ঞান হল ক্ষমতার গঠন ও বন্টনের বিশ্লেষণ। আর ডেভিড ইস্টন (David Easton)-এর মতে, রাষ্ট্রবিজ্ঞান হল মূল্যের কর্তৃত্বমূলক বিভাজন’ (The study of the authoritative allocation of values) |
রাষ্ট্রনিরপেক্ষ মতে যারা বিশ্বাসী অর্থাৎ, আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের মতে, যে শাস্ত্র, রাষ্ট্র ও সরকার ছাড়াও রাজনৈতিক দল, স্বার্থগােষ্ঠী, বিভিন্ন বেসরকারি সংগঠন, মানুষের রাজনৈতিক আচরণ, ক্ষমতা,প্রভাব, সংঘাত প্রভৃতি নিয়ে আলােচনা করে, তাকে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বলে। এসবের বাইরে রয়েছে শ্রেণি ও শ্রেণিসংগ্রামের দৃষ্টিকোণ থেকে মার্কসবাদী চিন্তাবিদদের প্রদত্ত স্বতন্ত্র ঘরানার সংজ্ঞা। মার্কসবাদী ধারণা অনুযায়ী সমাজের অভ্যন্তরে চলমান শ্রেণিসংগ্রামের সঙ্গে যাবতীয় কর্মপ্রক্রিয়ার বিচার ও বিশ্লেষণ করে রাষ্ট্রবিজ্ঞান। এতে রাষ্ট্রের শ্রেণিচরিত্র বিশ্লেষণের ওপর জোর দেওয়া হয়। ওপরের আলােচনার সারসংক্ষেপ করে বলা যায়, যে শাস্ত্র রাষ্ট্র, রাষ্ট্রের উৎপত্তি, ক্রমবিকাশ, রাষ্ট্র-সম্পর্কিত তত্ত্ব, রাষ্ট্র ও সরকারের উদ্দেশ্য ও কার্যাবলি, রাষ্ট্র ও নাগরিকের সম্পর্ক, সংবিধান, সরকার, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, ব্যক্তি ও গােষ্ঠীর রাজনৈতিক আচরণ, প্রভাব ও ক্ষমতা, দ্বন্দ্ব ও দ্বন্দ্ব মীমাংসার প্রক্রিয়া, রাষ্ট্রের শ্রেণিচরিত্র, শ্রেণিসংগ্রাম প্রভৃতি বিষয়ে বিজ্ঞান নির্ভর আলােচনা ও মূল্যায়ন করে তাকেই রাষ্ট্রবিজ্ঞান বলে।
Tags
Political Science
