ইতিহাসের পাতায় 'মাৎস্যন্যায় যুগ' আসলে কী?

ইতিহাসের পাতায় 'মাৎস্যন্যায় যুগ' আসলে কী?

 ইতিহাসের পাতায় 'মাৎস্যন্যায় যুগ' আসলে কী?   

উত্তরঃ সংস্কৃত শব্দ মাৎস্যন্যায়-এর আক্ষরিক অর্থ দাঁড়ায় 'মাছের ন্যায়'। মাছেদের জগতে বড় মাছ কর্তৃক সাবাড় হয় ছোট ছোট মাছ। দুর্বল নিমেষেই হয়ে যায় সবলের গ্রাস। মাছেদের জগতে যদিও বা এটাই নিয়ম, কিন্তু মানবসমাজে তা ঘোরতর অন্যায়। মাৎস্যন্যায় শব্দ দ্বারা সেই সময়, রাষ্ট্র বা সমাজ ব্যবস্থার অবস্থাকে নির্দেশ করা হয় যখন, মাছদের জগতের মতো ছোটরা বড়দের হাতে, দুর্বলরা সবলদের হাতে, কিংবা ক্ষমতাহীনরা শোষিত হয় ক্ষমতাবানদের হাতে। অরাজকতা আর বিশৃঙ্খলা গ্রাস করে পুরো সমাজ কিংবা রাষ্ট্রকে। সমাজ থেকে লোপাট হয়ে যায় স্বাভাবিক নিয়ম কিংবা সমতা।

সময়কাল ঃ প্রাচীন বাংলার ইতিহাসকে মোটামুটি তিনটি ভাগে ভাগ করা যায়। প্রথম ভাগে প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকে গুপ্ত শাসন পর্যন্ত, দ্বিতীয় ভাগে গুপ্ত-উত্তর কাল থেকে শশাঙ্কের শাসনামল পর্যন্ত এবং তৃতীয় ভাগে শশাঙ্ক পরবর্তী বিশৃঙ্খলার যুগ থেকে পাল ও সেন শাসনামল। মাৎস্যন্যায়ের সময়টি ছিল তৃতীয় ভাগের শুরুর দিকে। মোটামুটিভাবে ৬৫০ খ্রিস্টাব্দ থেকে ৭৫০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যকার প্রায় একশো বছর।  ৬০৬ খ্রিস্টাব্দের দিকে শশাঙ্ক গৌড়ে স্বাধীন, সার্বভৌম রাজ্য প্রতিষ্ঠা করতে সমর্থ হয়েছিলেন। তাকেই আখ্যা দেওয়া হয় বাংলা অঞ্চলের প্রথম স্বাধীন নরপতি হিসেবে। পরবর্তী গুপ্ত শাসকদের কাছ থেকে তিনি গৌড় রাজ্য দখল করে কর্ণসুবর্ণে তার রাজধানী স্থাপন করেছিলেন। শশাঙ্ক গৌড়ের সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী হয়ে গৌড়ের সীমা বৃদ্ধি করেছিলেন মগধ ও উড়িষ্যার উত্তরাঞ্চল পর্যন্ত।  আর্যমঞ্জুশ্রীমূলকল্প গ্রন্থের বিবরণ অনুযায়ী, ৬৩৭ খ্রিস্টাব্দে মৃত্যুর আগে শশাঙ্ক রাজ্য শাসন করেছিলেন প্রায় সতেরো বছর। তিনি ছিলেন একজন শক্তিশালী নৃপতি এবং তার সময়ে রাজনৈতিক শৃঙ্খলাও বজায় ছিল। তার হাত ধরেই উত্তর ভারতীয় রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তার করে গৌড়। কিন্তু তার মৃত্যুর যোগ্য উত্তরসুরীর অভাবসহ নানা কারণে বাংলার আকাশে নেমে আসে ঘোর অন্ধকার। শুরু হয় এক অভাবনীয় বিশৃঙ্খলার যুগ 'মাৎস্যন্যায়'।

সে সময় বাংলার অবস্থা  কেমন ছিল ?

মাৎস্যন্যায় চলাকালীন সময়ের প্রকৃত চিত্র সম্পর্কে তথ্যসূত্রের অপ্রতুলতা ও সীমাবদ্ধতার জন্য খুব বেশি জানা সম্ভব হয় না। শশাঙ্কের মৃত্যুর পর চীনা পরিব্রাজক হিউয়েন সাং ৬৩৮ খ্রিস্টাব্দে বাংলায় এসেছিলেন। তার বিবরণ অনুযায়ী এ অঞ্চলে পাঁচটি রাজ্যের কথা জানা যায়। তখনো মাৎস্যন্যায় যুগ শুরু হয়নি। বৌদ্ধগ্রন্থ আর্যমঞ্জুশ্রীকল্পে উল্লেখিত বিবরণ অনুযায়ী শশাঙ্কের মৃত্যুর পর, গৌড়ের অন্তর্বিদ্রোহ ও অরাজকতায় ছিন্ন-ভিন্ন হয়ে যাওয়ার বিষয়ে বলা আছে।  

মাৎস্যন্যায়ের সমাপ্তি ও পাল বংশের প্রতিষ্ঠাঃ  

রাজা গোপালের হাত ধরে প্রতিষ্ঠা লাভ করে পাল বংশ। গোপাল একটি অনিশ্চিত রাজনৈতিক অবস্থায় তার দৃঢ় ভূমিকা রাখতে সমর্থ হয়েছিলেন। যার ফলে বাংলা অঞ্চল দীর্ঘ রাজনৈতিক অরাজকতা থেকে মুক্ত হয়। তিনি ঠিক কত বছর রাজত্ব করেছিলেন, তা নিয়ে মতপার্থক্য আছে। লামা তারানাথের মতে তিনি প্রায় ৪৫ বছর রাজ্য শাসন করেছিলেন এবং ৭৯৫ খ্রিস্টাব্দে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তবে রমেশচন্দ্র মজুমদারের মতে তার রাজ্যশাসনের সময় ছিল ২০ থেকে ৩০ বছর এবং তিনি পরলোকগমন করে ৭৭০ খ্রিস্টাব্দে।  তবে যা-ই হোক, পাল বংশকে একটি শক্তিশালী ভিত্তির উপর দাঁড় করিয়ে যেতে সমর্থ হয়েছিলেন গোপাল। তার মৃত্যুর পর তার পুত্র ধর্মপাল পাল বংশকে নিয়ে যান অনন্য উচ্চতায়। পাল বংশের ইতিহাসে গোপালের পুত্র ধর্মপালকেই বলা হয় সর্বশ্রেষ্ঠ নৃপতি। পাল শাসন প্রতিষ্ঠার পর এই অঞ্চলের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার অবসান হয় এবং শক্তিশালী ও স্থায়ী শাসন ব্যবস্থা গড়ে ওঠে। ফলত, পাল বংশের শাসন টিকেছিল প্রায় চারশো বছর।


Lob (Admin)

This site was launched on March 1, 2019. Today it is appreciated by millions of students. This site has changed a lot in the last two years and I have tried to do better every time.

Please Do Not Enter Any Span Link in The Comment Box

Previous Post Next Post

نموذج الاتصال