ভারত ছাড়ো আন্দোলনের পটভূমি / কারণ
ভুমিকাঃ ভারতের জাতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনের সর্বশেষ বৃহৎ মরিয়া গণ প্রচেষ্টা হল
ভারত ছাড়ো আন্দোলন । গান্ধীজী ব্রিটিশ সরকারের উদ্দেশ্যে ‘ হরিজন ’ পত্রিকায় লেখেন
( ১৯৪২ খ্রি. ২৪ মে ) — ভারতকে ঈশ্বরের হাতে ছেড়ে দাও , না হলে তাকে নৈরাজ্যের হাতে
ছেড়ে চলে যাও ( ‘ Leave India to God . If that is too much , then leave her to
anarchy ’ )
ক্রিপস প্রস্তাবের ব্যর্থতাঃ ক্রিপস্
প্রস্তাবের ব্যর্থতায় ভারতবাসী অনুভব করে যে — ইংরেজ সরকার কখনোই স্বেচ্ছায় তাদেরকে
স্বাধীনতা ফিরিয়ে দেবে না । তাই স্বাধীনতা পেতে হলে সরাসরি ইংরেজদের সঙ্গে সংগ্রামে
লিপ্ত হওয়া ছাড়া দ্বিতীয় কোনো পথ নেই ।
ব্রিটিশ দমননীতিঃ ব্রিটিশ সরকার তার সামরিক বাহিনী দ্বারা ভারতবাসীর
ওপর যে অকথ্য নির্যাতন , অত্যাচার চালিয়ে আসছিল তাতে ভারতীয়রা বিক্ষুদ্ধ হয়ে মুক্তির
পথ খুঁজতে শুরু করেছিল । ব্রিটিশরা দীর্ঘদিন ধরে ভারতীয়দের কালা আদমি বলে উপেক্ষা
করে আসার পাশাপাশি ভারতীয় নারীদের প্রতি অশালীন আচরণ শুরু করলে ভারতীয়দের ধৈর্যচ্যুতি
ঘটে ।
দ্রব্যমূল্যের অস্বাভাবিক বৃদ্ধিঃ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তী সময়ে প্রয়োজনের
তুলনায় খাদ্যের জোগান কম হওয়ায় মূল্যবৃদ্ধি ঘটে । চালের খুচরো দাম বেড়ে হয় ৩০-৫০
টাকা প্রতি মণ , কেরোসিন ও কাপড় , ওষুধপত্র প্রভৃতি দুষ্প্রাপ্য হয়ে পড়ে । এই সুযোগে
কালোবাজারি ও মজুতদাররা ফায়দা তোলার চেষ্টা করে । ফলে ব্রিটিশের ওপর ভারতবাসীর বিশ্বাস
সম্পূর্ণ লুপ্ত হয় — তারা ব্রিটিশ শাসনের অবসানের লক্ষ্যে সর্বশেষ গণ আন্দোলনে শামিল
হয় ।
স্বাধীনতার তীব্র আকাঙ্ক্ষাঃ স্বাধীনতার জন্য ভারতবাসী আর বিন্দু মাত্র অপেক্ষা
করতে রাজি ছিল না । অসহযোগ , আইন অমান্য আন্দোলন ভারতবাসীর স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষাকে
তীব্রতর করে তুলেছিল । ভারতবাসী চেয়েছিল শেষবারের মতো এক সর্বভারতীয় গণ আন্দোলন গড়ে
তুলে ব্রিটিশের কাছ থেকে স্বাধীনতা ছিনিয়ে নিতে । তাই ঐতিহাসিক অমলেশ ত্রিপাঠী লিখেছেন— “ ভারত
ছাড়ো আন্দোলনে গান্ধি যতটা নেতা , ততটাই জনগণের ইচ্ছার দাস ।”
শীর্ষ নেতাদের জঙ্গি মনোভাবঃ ব্রিটিশ
সরকারের বিরুদ্ধে দেশের শীর্ষ নেতাদের জঙ্গি মানসিকতা , বিশেষত গান্ধীজীর অনমনীয় মনোভাব
আর – একটি গণ আন্দোলনের পটভূমি রচনা করেছিল । গান্ধীজী দেশবাসীর উদ্দেশে করেঙ্গে ইয়ে
মরেঙ্গে মন্ত্র ঘোষণা করেন । জওহরলাল এ প্রসঙ্গে
বলেছেন — গান্ধীজীকে ইতিপূর্বে আর কখনও এতটা ব্রিটিশ বিরোধী দেখা যায়নি ।
জাপানি আক্রমণের সম্ভাবনা: দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার রণাঙ্গনে
ব্রিটিশের বিরুদ্ধে জাপানের অগ্রগতি ভারতবাসীর মনে যুগপৎ এক আশা ও আশঙ্কার জন্ম দেয়
। তারা আশঙ্কা করে এবার ব্রিটিশ শাসিত ভারতেও জাপান আক্রমণ করবে । ব্রিটিশের স্বার্থরক্ষার
যুদ্ধে মরবে সাধারণ ভারতবাসী । এই আশঙ্কায় ভারতীয় নেতারা এক ব্রিটিশ বিরোধী সংগ্রাম
গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন । মৌলানা আজাদের মতে
, জাপানি আক্রমণের সম্ভাবনাই গান্ধীজীকে এক গণ আন্দোলনের দিকে ঠেলে দেয় ।
ভারত ছাড়ো আন্দোলনের ব্যর্থতার
কারণ:
[1] উপযুক্ত শীর্ষ নেতৃত্বের অভাব:
ভারত ছাড়ো আন্দোলন সম্পূর্ণরূপে গান্ধিজির নেতৃত্বের ওপর নির্ভরশীল ছিল। কিন্তু আন্দোলন
শুরু হওয়ার আগেই গান্ধিজি-সহ কংগ্রেসের সব শীর্ষনেতাকে কারারুদ্ধ করা হয়। গান্ধিজির
অবর্তমানে সেই আন্দোলনকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার মতো শীর্ষ নেতার অনুপস্থিতিতে এই আন্দোলন
ব্যর্থ হয়।
[2] কমিউনিস্ট-সহ অন্যান্য দলের
বিরোধিতা: ভারতের কমিউনিস্ট দল পরােক্ষভাবে ভারত ছাড়ো আন্দোলনের বিরোধিতা করেছিল।
জাতীয় আন্দোলনের মূলস্রোত থেকে আলাদা হয়ে গিয়ে তারা ব্রিটিশের সহযোগিতা করে। মুসলিম
লিগ, অনুন্নত সম্প্রদায়, লিবারেল গোষ্ঠী, হিন্দু মহাসভা, র্যাডিক্যাল ডেমােক্র্যাটিক
পার্টি এই আন্দোলনে সহযোগিতা করেনি। ফলস্বরূপ আন্দোলন ব্যর্থ হয়।
[3] অসময়ে সূচনা: সুভাষচন্দ্র
বসু ১৯৩৯ খ্রিস্টাব্দে জাতীয় কংগ্রেসের সভাপতি থাকাকালীন এই আন্দোলনের সূচনা করতে
চেয়েছিলেন কিন্তু গান্ধি অনুগামীরা তখন তা করেননি। সেই আন্দোলন গান্ধিজি শুরু করেন
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষের দিকে, যখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের রণাঙ্গনে ইংল্যান্ড-সহ
মিত্রপক্ষ সুবিধাজনক অবস্থায় রয়েছে। ফলে এই বিলম্ব আন্দোলনকে ব্যর্থ করে।
ভারত ছাড়ো বা আগস্ট আন্দোলনের গুরুত্বঃ
[1] স্বাধীনতার অজেয় সংকল্প:
১৯৪২-এর ভারত ছাড়ো আন্দোলন ছিল ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের চূড়ান্ত পর্যায়। ব্রিটিশ
শাসনের প্রতি ভারতবাসীর ঘনীভূত ক্ষোভ ও তা থেকে মুক্তির জন্য অজেয় সংকল্প এই বিদ্রোহে
সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়। এই আন্দোলনে সমাজের গরিব শ্রেণির অংশগ্রহণের সুন্দর বিবরণ
রয়েছে সতীনাথ ভাদুড়ির 'জাগরী' এবং 'টোড়াই চরিত মানস’—এই দুই
উপন্যাসে।
[2] সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায়
রাখা: মুসলিম লিগ এই আন্দোলনে যোগ না দিলেও উত্তরপ্রদেশ, বিহার, চট্টগ্রাম, শিলচর
প্রভৃতি স্থানের বহু মুসলিম এই আন্দোলনে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে অংশ নেয়। আন্দোলন
চলাকালে কোথাও কোনো সাম্প্রদায়িক বিরোধ বাধেনি। তাই সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও হিন্দু-মুসলিম
ঐক্য ছিল এই আন্দোলন্সের এক বিশাল সম্পদ।
[3] জাতীয় বিপ্লব: ৪২-এর আন্দোলনের
প্রকৃতি বিশ্লেষণ করতে গিয়ে জওহরলাল নেহরু বলেছিলেন- "নেতা সংগঠন নেই, উদ্যোগ
আয়োজন কিছু নেই, কোনো মন্ত্রবল নেই, অথচ একটা অসহায় জাতি স্বতঃস্ফূর্তভাবে কর্মপ্রচেষ্টার
আর কোনো পথ না পেয়ে বিদ্রোহী হয়ে উঠল—এ দৃশ্য বাস্তবিকই বিস্ময়ের।"
এই আন্দোলনকে তিনি ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দের মহাবিদ্রোহের সঙ্গে তুলনা করেছেন। বড়ােলাট লর্ড
লিনলিথগোও এই আন্দোলনকে ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দের পর সবচেয়ে বড়ো বিদ্রোহ বলে উল্লেখ করেছেন।
অরুণ চন্দ্র ভূঁইয়া তাঁর 'The Quit India Movement' গ্রন্থে বলেছেন যে, এই আন্দোলনের
ফলে একটি অভূতপূর্ব জাতীয় জাগরণ ও জাতীয় ঐক্যবােধ গড়ে ওঠে।
[4] স্বাধীনতা অর্জনের ভিত্তিস্থাপন:
৪২-এর আন্দোলনের গভীরতা ও ব্যাপকতা যে ভারতের স্বাধীনতার ভিত্তিভূমি রচনা করেছিল, সে
বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। একদিকে যখন সুভাষচন্দ্রের সশস্ত্র বিপ্লবী তৎপরতায় ভারতের
ব্রিটিশ সরকার আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিল, ঠিক তখনই ভারত ছাড়ো আন্দোলনের তীব্রতা সাম্রাজ্যবাদী
ব্রিটিশ সরকারের প্রশাসনিক ভিত্তিকে নড়বড়ে করে দিয়েছিল। এর ফলে ইংরেজরা ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দে
ভারত ছাড়তে বাধ্য হয়।
[5] কংগ্রেসের মর্যাদা পুনঃপ্রতিষ্ঠা:
এই আন্দোলন থেকে সবচেয়ে লাভবান হয়েছিল জাতীয় কংগ্রেস। আন্দোলনকালে মহাত্মা গান্ধির
অনশন জাতির হৃদয়ে কংগ্রেসের মর্যাদাকে পুনরায় অধিষ্ঠিত করে। কংগ্রেস নেতাদের দুঃখবরণ
ও আত্মত্যাগ দেখে জাতি আপ্লুত হয়। সমাজবাদী কংগ্রেস নেতা জয়প্রকাশ নারায়ণ
'Towards Struggle' গ্রন্থে লেখেন, "The Congress alone is the country's
salvation."
[6] গণ আন্দোলন হিসেবে: এই
আন্দোলনে শ্রমিক ও কৃষক-সহ সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি স্বতঃস্ফূর্তভাবে শামিল হয়ে একে
গণ আন্দোলনের রূপদান করে। নিখিল ভারত কংগ্রেস কমিটিও এই আন্দোলন গণযুদ্ধ আখ্যা দিয়েছিল।
সর্দার বল্লভভাই প্যাটেলের মতে ব্রিটিশ শাসনাধীন ভারতে এ ধরনের ব্যাপক বিদ্রোহ ইতিপূর্বে
আর কখনও সংঘটিত হয়নি। নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের 'মন্ত্র মুখর' উপন্যাসে আগস্ট বিপ্লব
বা ভারত ছাড়ো আন্দোলনের গণজাগরণের চিত্র ধরা পড়ে।
মূল্যায়নঃ ভারত ছাড়ো আন্দোলনের মধ্যে দিয়ে গান্ধীজী ও জাতীয়
শীর্ষ নেতৃবৃন্দ যে কোনো মূল্যে স্বাধীনতা অর্জন করতে চেয়েছিলেন । এমনকি ব্রিটিশদের
কবল থেকে মুক্ত হতে ভারতবাসী যদি নিজের হাতে অস্ত্র তুলে নেয় তাতেও গান্ধীজীর আপত্তি
ছিল না । তাই দেখা যায় অসহযোগ আন্দোলনে চৌরিচৌরার মতো একটি ঘটনায় গান্ধীজী আন্দোলন
বন্ধের সিদ্ধান্ত নিলেও আগস্ট আন্দোলনে আরও অনেক বেশি হিংসাত্মক ঘটনা ঘটলেও তিনি আন্দোলনের
রাশ টেনে ধরেননি ।

