উত্তরঃ বাংলা সাহিত্যের বিস্ময়কর প্রতিভা মাইকেল মধুসূদন দত্ত রচিত উল্লেখযােগ্য চারটি কাব্যগ্রন্থ হল —“তিলােত্তমাসম্ভব’, ‘মেঘনাদবধ’, ‘বীরাঙ্গনা’ এবং ব্রজাঙ্গনা। এগুলি আখ্যানকাব্য। এ ছাড়াও তিনি রচনা করেন সনেটগুচ্ছ ‘চতুর্দশপদী কবিতাবলী।
■ কবি হিসেবে মধুসূদনের বিশিষ্টতা : মিলটনের Blank Verse-এর আদলে বাংলায় অন্তমিলহীন চোদ্দোমাত্রার অমিত্রাক্ষর ছন্দের প্রবর্তনা বাংলা কবিতায় মধুসূদনের সবচেয়ে উল্লেখযােগ্য অবদান। ‘তিলােত্তমাসম্ভব’-এ এর সূচনা এবং ‘মেঘনাদবধ’-এ সার্থক প্রতিষ্ঠা ঘটে, বীরাঙ্গনাতেও এরই অনুসৃতি। মধুসূদন বাংলা কবিতায় সার্থক সাহিত্যিক মহাকাব্যের প্রথম রচয়িতা। তাঁর ‘মেঘনাদবধ’-এ নতুন যুগচেতনায় বীর ও করুণরসের সন্নিবেশে রামায়ণের নবনিরীক্ষা কাব্যদর্শনে আধুনিকতার প্রতিষ্ঠা ঘটায়, অথচ তার পরিপ্রেক্ষিতে থাকে মহাকাব্য।
বাংলা সাহিত্যে সার্থক পত্রকাব্য রচনার দৃষ্টান্তও মধুসূদনই স্থাপন করেন। ওভিদের Heroides-এর অনুসরণে রচিত তাঁর ‘বীরাঙ্গনায় আছে এগারােটি পত্র, যেমন—দুষ্মন্তের প্রতি শকুন্তলা, সােমের প্রতি তারা, দশরথের প্রতি কৈকেয়ী, নীলধ্বজের প্রতি জনা, দুর্যোধনের প্রতি ভানুমতী, পুরুরবার প্রতি উর্বশী ইত্যাদি। পুরাণ-মহাকাব্য ইত্যাদি থেকে সংগৃহীত নারীচরিত্রগুলির মধ্য দিয়ে নারীত্বের বিচিত্ররূপকে ধরতে চেয়েছেন কবি।
বাংলায় প্রথম সনেট রচনার কৃতিত্বও মধুসূদনেরই। ভার্সাই-এ থাকাকালীন পেত্রার্ক-এর সনেটের অনুসরণে লেখা চতুর্দশপদী কবিতাবলী’র কবিতাগুচ্ছে প্রকাশিত হয় দেশ থেকে বিচ্ছিন্ন যন্ত্রণাকাতর এক কবিসত্তার আর্তি। আর এর মধ্য দিয়ে বাংলা গীতিকবিতার সার্থক সূচনাও ঘটান মধুসূদন। শ্যামা জন্মদা, কপােতাক্ষ নদ থেকে কাশীদাস—দেশের জন্য মন কেমনের অনুভূতিতে গীতিকাব্যের আবেগময় চরিত্র লাভ করে চতুর্দশপদী কবিতাবলী’। যদিও ইতিপূর্বে ত্রিপদী ছন্দে রচিত ব্রজাঙ্গনা’তে রাধার বিলাপ-আক্ষেপ ভাবসম্মিলনে গীতিকবিতার প্রাথমিক প্রস্তাবনা চোখে পড়েছিল। এইভাবে বহুবিধ অবদানের মধ্য দিয়ে বাংলা কাব্যসাহিত্যে নিজের অবস্থানকে অনস্বীকার্য করে তুলেছেন কবি মধুসূদন।
Tags
Bengali
