উত্তরঃ
মধুসূদন দত্তের অবদান : বাংলা কাব্যসাহিত্যে বিশেষত আখ্যানকাব্য ও মহাকাব্যে মধুসূদন দত্তের আবির্ভাব এক বিস্ময়কর ঘটনা। এককভাবে তিনি বাংলা কাব্যের সীমাকে অনেক দূর প্রসারিত করে দিয়েছেন, বাংলা আখ্যান কাব্যে প্রকৃত আধুনিকতার সূত্রপাত তারই হাতে।
মধুসূদন বাংলা পয়ারের কাঠামাের মধ্যে অন্ত্যমিল তুলে দিয়ে অমিত্রাক্ষর ছন্দ বা অমিল প্রবহমান পয়ারের প্রথম প্রয়ােগ করেছিলেন ‘পদ্মাবতী’ নাটকের একটি জায়গায়। তারপর এই ছন্দে তিনি রচনা করেন একটি সম্পূর্ণ আখ্যানকাব্য—“তিলােত্তমাস কাব্য’ (১৮৬০ খ্রিস্টাব্দ)। মধুসূদন এই কাব্যের আখ্যানভাগ সংগ্রহ করেন পুরাণ থেকে। সুন্দ-উপসুন্দ বধের জন্য তিলােত্তমা নামের অপ্সরা সৃষ্টির কাহিনিকে নিজের মনের মতাে করে সাজিয়ে তিনি পরিবেশন করেন এই কাব্যে। কাব্য হিসেবে এর মধ্যে কিছু কিছু ত্রুটিবিচ্যুতি লক্ষ করা গেলেও এই কাব্যেই অন্ত্যমিল বন্ধন থেকে বাংলা ছন্দের প্রথম মুক্তি ঘটে।
মধুসূদন দত্তের সর্বাধিক পরিচিত কাব্য এবং শ্রেষ্ঠ কীর্তি ‘মেঘনাদবধ কাব্য’(১৮৬১ খ্রিস্টাব্দ)। তিলােত্তমাসম্ভব কাব্য’-এর অমিত্রাক্ষর ছন্দ ‘মেঘনাদবধ কাব্য’-এ আরও পরিণত হয়ে উঠেছে।‘মেঘনাদবধ কাব্য’বাংলা ভাষায় রচিত প্রথম ও একমাত্র শিল্পসাৰ্থক সাহিত্যিক মহাকাব্য (Literary Epic)। এই কাব্যে মধুসূদন ভারতীয় মহাকাব্যের আদর্শকে বর্জন করে পাশ্চাত্য আদর্শকে গ্রহণ করতে চাইলেও ভারতীয় আদর্শকে পুরােপুরি অস্বীকার করতে পারেননি। রামায়ণের কাহিনি ও চরিত্রগুলিকে তিনি নিজস্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী পরিবর্তন করতে দ্বিধা করেননি। এই কাব্যে রাম-লক্ষ্মণ নন, রাবণ-মেঘনাদই নায়ক-সহনায়কে পরিণত হয়েছেন। উনিশ শতকের নারীর ব্যক্তিস্বাতন্ত্রের চেতনার আলােয় রাধাকৃষ্ণের কাহিনি নিয়ে মধুসূদন লেখেন ‘ব্রজাঙ্গনা'। আর ১৮৬২ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত ‘বীরাঙ্গনা কাব্য’ বাংলা সাহিত্যের প্রথম পত্রকাব্য—সােমের প্রতি তারা, দশরথের প্রতি কৈকেয়ী, দুষ্মন্তের প্রতি শকুন্তলা, নীলধ্বজের প্রতি জনা ইত্যাদি পত্র স্থান পেয়েছে এখানে। উনিশ শতকের নবজাগরণের চেতনায় পৌরাণিক নারীদের নানারূপের নবরূপায়ণ ঘটেছে এই কাব্যে।
Tags
Bengali
