উত্তরঃ
গিরিশচন্দ্র ঘােষের অবদান : বাংলা নাটকের ইতিহাসে সবচেয়ে জনপ্রিয় নাট্যকারের নাম গিরিশচন্দ্র ঘােষ। তাকে শুধু নাট্যকার বললেও ভুল হবে, তিনি ছিলেন একাধারে অভিনেতা, নাট্যকার, নাট্যশিক্ষক এবং নাট্যসংগঠক। অন্যের রচনার নাট্যরূপগুলি বাদ দিলে গিরিশচন্দ্রের নাটকগুলিকে পাঁচটি শ্রেণিতে ভাগ করা যেতে পারে। যেমন—(১) গীতিনাট্য, (২) ঐতিহাসিক নাটক, (৩) পৌরাণিক ও ভক্তিমূলক নাটক, (৪) সামাজিক নাটক, (৫) প্রহসন।
১) গীতিনাট্য: ‘অকালবােধন’, ‘আগমনী’, ‘দোললীলা’, ‘মায়াতরু’, ‘মােহিনী প্রতিমা’, ‘আলাদিন’, ‘আবু হােসেন’ প্রভৃতি তাঁর উল্লেখযােগ্য গীতিনাট্য।
২) ঐতিহাসিক নাটক : গিরিশচন্দ্র-রচিত ঐতিহাসিক নাটকগুলির মধ্যে ‘অশােক’, ‘সিরাজদৌল্লা’(১৯০৬), মীরকাশিম’ (১৯০৬) এবং ছত্রপতি শিবাজী’ (১৯০৭) বিশেষ উল্লেখযােগ্য। এই নাটকগুলিতে পরাধীন ভারতবাসীর সমসাময়িক রাজনৈতিক চেতনা ও স্বদেশপ্রেম প্রকাশিত হয়েছে; তবে অতিরিক্ত উচ্ছ্বাস, অতি-নাটকীয় ধরন, অনৈতিহাসিকতা এদের ঐতিহাসিক নাটক হিসেবে পরিপূর্ণ সাফল্য দেয়নি।
৩) পৌরাণিক ও ভক্তিমূলক নাটক : পৌরাণিক ও ভক্তিমূলক নাটক রচনার ক্ষেত্রে গিরিশচন্দ্র বিপুল সাফল্য অর্জন করেছিলেন। রাবণবধ’, ‘সীতার বনবাস’, ‘অভিমন্যু বধ’, ‘রামের বনবাস’, ‘পাণ্ডবের অজ্ঞাতবাস’, ‘ধুবচরিত্র’, ‘জনা’ প্রভৃতি তাঁর পৌরাণিক নাটক। তিনি অবতার বা মহাপুরুষের জীবন অবলম্বনেও বেশ কয়েকটি ভক্তিমূলক নাটক রচনা করেছিলেন, যেমন—“চৈতন্যলীলা’, ‘বিল্বমঙ্গল’, নিমাইসন্ন্যাস’, বুদ্ধদেবচরিত’ প্রভৃতি। তাঁর পৌরাণিক নাটকগুলিতে ভক্তি ও ধর্মাদর্শের উচ্ছ্বসিত প্রকাশে দর্শক ও পাঠকের মনকে ছোঁয়ার চেষ্টা রয়েছে।
৪) সামাজিক নাটক : গিরিশচন্দ্র যে কয়েকটি পরিবারাশ্রিত সামাজিক নাটক রচনা করেন, সেগুলির মধ্যে ‘প্রফুল্ল’, ‘হারানিধি, বলিদান’, শাস্তি কি শান্তি’ বিশেষ উল্লেখযােগ্য। পারিবারিক জীবনের নানান সমস্যার চিত্র তুলে ধরতে গিয়ে কোনাে কোনাে ক্ষেত্রে তিনি বৃহত্তর সামাজিক সমস্যার দিকেও ইঙ্গিত করেছেন। তাঁর এই শ্রেণির নাটকগুলির মধ্যে শ্রেষ্ঠ নাটক ‘প্রফুল্ল’, যােগেশের ‘সাজানাে বাগান’ শুকিয়ে যাওয়ার যন্ত্রণাময় কাহিনি একে বাংলা নাটকের ইতিহাসে অন্যতম শ্রেষ্ঠ পারিবারিক ট্র্যাজেডির মর্যাদা দিয়েছে।
৫) প্রহসন : তাঁর প্রহসনগুলির মধ্যে উল্লেখযােগ্য কয়েকটি হল ‘ভােটমঙ্গল’, ‘হীরার ফুল’, ‘বেল্লিক বাজার’, বড় দিনের বকশিস’, ‘য্যায়সা কা ত্যায়সা’ প্রভৃতি।
সব মিলিয়ে বলা যায়, কিছু কিছু ত্রুটিবিচ্যুতি সত্ত্বেও বিষয়বস্তুর বৈচিত্র্যে, নাটককে দর্শকের সঙ্গে সংযুক্ত করার ক্ষেত্রে বৈপ্লবিক ভূমিকায় নাট্যকলা আর অভিনয়কলার মিশ্রণ ঘটিয়ে গিরিশচন্দ্র এককভাবে বাংলা নাট্যজগৎকে যেভাবে সমৃদ্ধ করেছেন তার তুলনা নেই।
Tags
Bengali
