উত্তরঃ
বাংলা নাট্যসাহিত্যে মধুসূদন দত্তের অবদান : ১৮৫৮ খ্রিস্টাব্দে বেলগাছিয়া নাট্যশালায় রামনারায়ণ তর্করত্নের 'কুলীনকুলসর্বস্ব’ নাটকের অভিনয় দেখে মধুসূদন লিখেছিলেন—
“অলীক কুনাট্য রঙ্গে মজে লােক রাঢ় বঙ্গে নিরখিয়া প্রাণে নাহি সয়।”
এই মমর্যন্ত্রণাই বাংলা সাহিত্যে নাট্যকার মধুসূদনের আবির্ভাব নিশ্চিত করেছিল। মধুসূদন চারটি পূর্ণাঙ্গ নাটক এবং দুটি প্রহসন রচনা করেন। পূর্ণাঙ্গ নাটক চারটির নাম যথাক্রমে শর্মিষ্ঠা (১৮৫৯), ‘পদ্মাবতী’ (১৮৬০), কৃষ্ণকুমারী’ (১৮৬১) এবং মায়াকানন’ (১৮৭৪); প্রহসন দুটি হল—একেই কি বলে সভ্যতা’ এবং বুড়াে শালিকের ঘাড়ে রোঁ (১৮৬১)।
মধুসূদনের প্রথম নাটক 'শর্মিষ্ঠা' মহাভারতের আদিপর্বের যযাতি, শর্মিষ্ঠা ও দেবযানীর কাহিনি অবলম্বন করে রচিত হলেও নাট্যরচনায় শােকসপিয়রীয় রীতিকে অনুসরণ করা হয়েছে। সেকালের যথেষ্ট মঞ্চসফল এই নাটকটি আধুনিক বাংলা নাটকের পথপ্রদর্শনে বিশেষ উল্লেখযােগ্য।
‘পদ্মাবতী’ নাটকে গ্রিক পুরাণের 'Apple of Discord থেকে নেওয়া কাহিনি-কাঠামােতে মধুসূদন ভারতীয় পুরাণের ছদ্মবেশ পরিয়েছেন। গ্রিক নাটকের জুনাে, ভেনাস, প্যালাস, প্যারিস এবং হেলেন মধুসূদনের রচনায় রূপান্তরিত হয়েছেশচী, রতি, মুরজা, ইন্দ্রনীল এবং পদ্মাবতী চরিত্রে। উল্লেখ্য যে, এই নাটকের একটি চরিত্রের মুখেই মধুসূদন প্রথম অমিত্রাক্ষর ছন্দ ব্যবহার করেন।
কৃষ্ণকুমারী’ নাটকের কাহিনি-অংশ গৃহীত হয়েছে কর্নেল টডের লেখা 'Annals and Antiquities of Rajasthan' গ্রন্থ থেকে। মেবারের স্বাধীনতা রক্ষায় রাজকন্যা কৃয়কুমারীর আত্মত্যাগের কাহিনি এর বিষয়। অসংখ্য উপকাহিনি সমন্বিত এই ঐতিহাসিক ট্রাজেডি মধুসূদনের শ্রেষ্ঠ নাট্যসৃষ্টি। তবে শর্মিষ্ঠা’, ‘পদ্মাবতী’ এবং কৃয়কুমারী’তে মধুসূদনের নাট্যপ্রতিভার যে-পরিচয় পাওয়া যায়, মায়াকানন ‘’ নাটকে তা একান্তভাবে অনুপস্থিত।
নাট্যকার মধুসূদনের লেখা ‘একেই কি বলে সভ্যতা’ এবং 'বুড়াে শালিকের ঘাড়ে রোঁ’ নামক প্রহসন দুটি প্রথম বাংলা প্রহসন হিসেবে এবং রচনাগুণে বাংলা সাহিত্যের অমূল্য সম্পদরূপে বিবেচ্য। একেই কি বলে সভ্যতার মধ্যে তিনি সেকালের উচ্চশিক্ষিত কিন্তু উৎঙ্খল যুবকদের স্বরূপতুলে ধরেছেন; আর বুড়ােশালিকের ঘাড়ে রোঁ’ প্রহসনটির মধ্যে ফুটে উঠেছে এক গ্রাম্য জমিদারের কদর্য চরিত্র। আজও এই প্রহসন দুটির নাট্যোপযযাগিতা এতটুকু ম্লান হয়নি।
Tags
Bengali
