উত্তরঃ বিহারীলালের পূর্বে বা সমকালে বাংলায় মহাকাব্য বা কাহিনিকাব্য রচনার ধারাই প্রধান ছিল। বিহারীলালের রচনাতেই প্রথম ব্যাপকভাবে আত্মভাবমূলক কবিতার প্রাধান্য দেখা যায়। ভােরের পাখির সুমিষ্ট কণ্ঠের গানে যেমন প্রভাতের সূচনা ঘােষিত হয়, তেমনি বিহারীলালের রচনার মধ্য দিয়ে বাংলা কাব্যকুঞ্জে গীতিকবিতার দিগন্ত আলােকিত হয়ে ওঠে। কবি-রচিত উল্লেখযােগ্য কাব্যগ্রন্থগুলি হল সংগীত শতক’(১৮৬২), বঙ্গসুন্দরী’ (১৮৭০), নিসর্গ সন্দর্শন’ (১৮৭০), বন্ধুবিয়ােগ’ (১৮৭০), ‘প্রেমপ্রবাহিনী’ (১৮৭১), সারদামঙ্গল’, (১৮৭৯) এবং সাধের আসন’(১৮৮৮-৮৯)। বিহারীলাল ‘নিসর্গসন্দর্শন’কাব্যের কবিতাগুলিতে নিসর্গ প্রকৃতিতে ব্যক্তিসত্তা আরােপ করে, সচেতন কবি হৃদয়ের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনের মাধ্যমে যে নবতম কাব্যশৈলীর উদ্ভাবন ঘটিয়েছেন, তা গীতিকবিতার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। দশটি সর্গের বঙ্গসুন্দরী’তে নারীহৃদয়ের প্রশস্তিতে রােমান্টিকতার প্রকাশ ঘটেছে। তবে বিহারীলালের শ্রেষ্ঠ কাব্য সারদামঙ্গল’, যেখানে কবির সৌন্দর্যচেতনা ও গীতিবৈশিষ্ট্য পরিপূর্ণতা লাভ করেছে। কবির কথায়—“মৈত্রীবিরহ, প্রীতিবিরহ, সরস্বতীবিরহ যুগপৎ ত্রিবিধবিরহে উন্মত্তবৎ হইয়া আমি সারদামঙ্গল সঙ্গীত রচনা করি।” এখানে কবি সারদাকে কখনও জননী, কখনও প্রেয়সী, আবার কখনও বা কন্যাবিশেষ কল্পনা করে আবেগের এক লীলাক্ষেত্র রচনা করেছেন। আর 'সাধের আসন’-এ রচনা করেছেন এর টীকাভাষ্য, প্রেমের তত্ত্বরূপ দেওয়ার চেষ্টা আছে এই ওয়েবসাইটে।
পরিশেষে বলতে হয়, বিহারীলালের আত্মভােলা কবিস্বভাব তাঁর কবিতার আঙ্গিককে কোনাে ক্ষেত্রে দুর্বল করে তুলেছে। বিহারীলালের কল্পনা অতিমাত্রায় Subjective' হওয়ার জন্যই তাঁর ছন্দে ও ভাষায় কিছু কিছু শিথিলতা প্রশ্রয় পেয়েছে। তা সত্ত্বেও বিহারীলাল চক্রবর্তীর কবিতা বাংলা কাব্যসাহিত্যের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
Tags
Bengali
