উত্তরঃ যে জ্ঞানে আমরা কোনাে বচনকে জানি সেই জ্ঞানকে বাচনিক জ্ঞান বলে। “সকল অধ্যাপক হন এমন যারা কলেজে পড়ান”– এরূপ জ্ঞানকে বাচনিক জ্ঞান বলে। এই দৃষ্টান্ত জ্ঞানকে প্রকাশ করে। যদু জানে যে কান্ট একজন দার্শনিক’– এখানেও কান্ট যে একজন দার্শনিক তা বচনের মাধ্যমেই প্রকাশিত হয়েছে। বাচনিক অর্থে জানা মানে কোনাে বচন বা বাক্যকে সত্য বলে জানা। যেমন, আমি জানি যে 2+2=8। বচনের ধর্ম সত্যতা বা মিথ্যাত্ব। তাই বলা হয় যে যা সত্য অথবা মিথ্যা তা-ই বচন। যে জ্ঞানের বিষয়। এই রকম একটি বচন তাকেই বাচনিক জ্ঞান বলে। আমি জানি যে বরফ সাদা এইখানে ‘যে’ শব্দটির পরে যা বলা হয় তা-ই জ্ঞানের বিষয় এবং এই বিষয়টি একটি বচন বা সত্য অথবা মিথ্যা হতে পারে। রাইল এই জাতীয় জ্ঞানকে Knowing that বলেছেন।
বাচনিক জ্ঞানের শর্ত দু’রকম— আবশ্যিক এবং পর্যাপ্ত। যে শর্তটি পূরণ না হলে জ্ঞান উৎপন্ন হতে পারবে না সেটি আবশ্যিক জ্ঞানের শর্ত। আর যে শর্ত পূরণ হলে কার্যটি ঘটে তা হলাে পর্যাপ্ত শর্ত।
একজন ব্যক্তি একটি বচনকে জানে তখনই বলা যাবে যদি বচনটি সত্য হয়। (ক) বচনটি সত্য হয়। (খ) সেই ব্যক্তি বচনটির সত্যতায় বিশ্বাস করে এবং (গ) তার এই বিশ্বাসের ভিত্তি থাকে।
এই তিনটি শর্তকেই জ্ঞানের আবশ্যিক শর্ত বলা হয়। এর মধ্যে কোনাে একটি শর্ত পূরণ না হলে জ্ঞান হবে না। কিন্তু কোনাে একটি শর্তকে পৃথকভাবে জ্ঞানের জন্য পর্যাপ্ত বলা যায় না। তিনটি শর্ত একত্রিত করলে জ্ঞানের আবশ্যিক ও পর্যাপ্ত শর্ত পাওয়া যায়।
(ক) সত্যতা : জ্ঞান হতে গেলে হবে সত্য বিষয়ের জ্ঞান। জ্ঞানের প্রথম শর্তটা হলাে, যে ব্যাপারকে আমরা জানব তা যথার্থ সত্য হবে। আমি ‘ক’ কে জানি। কি’ সত্য না হলে ‘ক’ যে জেনেছি এরকম কথা বলা যায় না। যখন বলি আমি জানি যে বরফের রং সাদা, তখন আমার বক্তব্য বরফের সাদা নিশ্চিত সত্য হবে। তা না হলে আমি জানি এরকম দাবি করা যায় না। যদি কোনাে ব্যক্তি এটি মিথ্যা বচন প্রসঙ্গে আমি জানি একথা বলে। তা হলে সে জানি’ শব্দটির অপব্যবহার করবে। আমি ‘ক’ বচনকে ‘জানি’ একথা তখনই বলা যাবে যদি ‘ক’ বচনটি সত্য হয়।
বচনের সত্যতা হলাে জ্ঞানের অত্যাবশ্যক শর্ত। বচনটি যদি সত্য না হয় তাহলে সেই বচন সম্বন্ধে জ্ঞান হয় না। কিন্তু বচনটি সত্য হলেই জ্ঞান উৎপন্ন হয় না। জগতের বিষয় সম্বন্ধে বহু সত্য বচন আছে। কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে আমরা সেই বচনগুলিকে জানি।
(খ) সত্যতায় বিশ্বাস : বাচনিক জ্ঞানের আর একটি শর্ত হলাে বক্তব্য বা ব্যাপারটি শুধু হলেই হবে না। তাকে বিশ্বাস করতে হবে। আমার টেবিলে একটি ঘড়ি আছে এবং ঘড়িটি যে আছে সে বিষয়ে আমার বিশ্বাস থাকবে তবেই বলতে পারবাে আমি জানি যে টেবিলে একটি ঘড়ি আছে। এই শর্তের ক্ষেত্রে ‘ক’-কে জানার অর্থ এরকম ‘ক’ সত্য, যেহেতু ‘ক’-এর সত্যতা সম্পর্কে আমার বিশ্বাস আছে। সত্য বক্তব্য সম্বন্ধে আমাদের জ্ঞান পেতে হলে ঐ বক্তব্যের সত্যতায় আমাদের বিশ্বাস থাকতে হবে। কোনাে কোনাে বচনকে আমরা বিশ্বাস না-ও করতে পারি। সেখানে জ্ঞানের প্রশ্ন নাও উঠতে পারে। কিন্তু যেখানে একটি বচনকে ‘জানি’ বলে দাবি করি সেখানে অবশ্যই বচনটিকে বিশ্বাস করতে হবে। বিশ্বাস ছাড়া জ্ঞান হয় না। জ্ঞানের এই শর্তটিকে বিশ্বাসের শর্ত বলা হয়।
বচনটির সত্য হওয়া বা বিশ্বাস থাকা এদু’টি শর্ত পূরণ না হলে জ্ঞান হয় না। একথা ঠিক। কিন্তু শর্ত দু’টি পূরণ হলেই জ্ঞান হচ্ছে একথা বলা যাবে না।
বিশ্বাসের ভিত্তি : বাচনিক জ্ঞানের পর্যাপ্ত শর্ত বলতে আমরা বুঝি বিশ্বাসের সম্পর্কে পর্যাপ্ত তথ্য-যুক্তি-সাক্ষ্যপ্রমাণ। কোনাে বিশ্বাস সত্য হলেই তা জ্ঞান হবে না, তার ঐ বিশ্বাসের ন্যায্যতা প্রমাণে তথ্য ও যুক্তি থাকা প্রয়ােজন। বিশ্বাসের সমর্থনে যুক্তিটি যদি সর্বজনগ্রাহ্য হয় তাহলে তাকে স্বীকার করা হবে এবং জ্ঞানের দাবিও স্বীকৃত হবে। একজন আবহাওয়া বিজ্ঞানী যদি বলেন, আমি জানি আগামী কাল বৃষ্টি হবে, তখন তার বিশ্বাস ভিত্তিহীন নয়। তার একথা বিশ্বাস করার অধিকার আছে। তিনি বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে ঐ বচনটির সত্যতা জানেন। তার এই বিশ্বাস ভিত্তিহীন নয় এবং সেইজন্য তাকে ‘জ্ঞান’ বলা যাবে।
Tags
Philosophy
