ভূগোলের সংজ্ঞা- 'Geography' অর্থাৎ ভূগোল শব্দটি সর্বপ্রথম ব্যবহার করেন গ্রীক পন্ডিত এরাটোস্থেনিস, ২৩৪ খ্রীস্টপূর্বাব্দে। দুটি গ্রিক শব্দ 'Geo' অর্থাৎ পৃথিবী এবং 'Graphien' অর্থাৎ বর্ণনা থেকে Geography শব্দটির উৎপত্তি হয়েছে। আক্ষরিক অর্থে, ভূগোল মানেই পৃথিবীর বর্ণনা। কিন্তু যুগে যুগে ভৌগোলিক, চিন্তাবিদ, দার্শনিকরা ভূগোলের অগণিত সংজ্ঞা দিয়েছেন।
ভূগোল পাঠের উদ্দেশ্য -
মানষিক চেতনার উন্মেষ:- প্রতিটি শিক্ষার মূল লক্ষ্য হল মানসিক চেতনার উন্মেষ ঘটানো l এই চেতনা থেকে একজন মানুষ তার জীবনযাত্রা ও তার মানোন্নয়ন সঠিক ভাবে করতে পারে l ভূগোল যেহেতু প্রাকৃতিক, আর্থ-সামাজিক, রাজনৈতিক প্রভৃতি বিভিণ্ন ধরনের পরিবেশ ও মনুষ্য জীবনে তার প্রভাব সমন্ধে আলোচনা করে ,তাই শিক্ষার্থীর মানসিক চেতনার বিকাশে ভূগোল এক অত্যাবশ্যকীয় বিষয়।
পৃথিবী ও তার বৈশিষ্ট সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন :- এই বিশাল পৃথিবীর দুটি ভৌগলিক স্থানের মধ্যে প্রচুর বিভেদতা রয়েছে, আবার অবস্থান ভেদে জলবায়ু, প্রাকৃতিক পরিবেশ, মানুষের অর্থনৈতিক কার্যাবলীর প্রকৃতি ও মানবীয় চারিত্রিক বৈশিষ্ট সদা পরিবর্তনশীল l পৃথিবীর এরুপ সামগ্রিক ও স্থানিক বৈশিষ্ট ও বিভেদতা সম্পর্কে জ্ঞান লাভের জন্য ভূগোল পাঠ অত্যাবশকীয়
যুক্তিবাদী, অন্বেষণী ও অনুসন্ধানী মনোভাবের বিকাশ :- ভূগোল বিজ্ঞানের ‘আঁতুড়ঘর ‘ l যেকোন রকম প্রার্থিব সংঘটন অন্যান্য বিজ্ঞানের মতোই ভূগোলে অনুসন্ধানী দৃষ্টিভঙ্গিতে যুক্তির মাধ্যমে গ্রহণ করা হয় l আবার ঐ সংঘটনকে পার্থিব বিভিণ্ন শক্তির প্রভাব দ্বারা আলোচনা করে উপস্থাপনা করা হয় l ফলে ভূগোল পৃথিবীর বিভিন্ন ঘটনা সম্পর্কে শিক্ষার্থীর মনে কৌতুহল জাগিয়ে তুলতে সক্ষম l এই কৌতুহল অন্বেষণী, অনুসন্ধানী, পর্যবেক্ষণ মূলক এবং যুক্তিবাদী মনোভাবের বিকাশে সাহায্য করে।
প্রাকৃতিক অবস্থা সম্পর্কে জ্ঞানলাভ :- ভূগোল কোন স্থানের প্রাকৃতিক অবস্থা, জলবায়ু ও ভূপ্রকৃতির সম্পর্ক, জলবায়ুর ভিত্তিতে মানুষের দৈহিক গঠণ, সাংস্কৃতির বিকাশ,রুচি-আহার-জীবিকার প্রাথমিক বৈশিষ্ট বসতির গঠণ প্রভৃতি নানা বিষয় সম্পর্কে আলোচনা করে থাকে l অর্থাত্ পৃথিবীর বিভিণ্ন স্থানের প্রকৃতি ও মানবীয় সমাজ তথা মানুষ সম্পর্কে জ্ঞান লাভের অদ্বিতীয় মাধ্যম হল ভূগোল
প্রাকৃতিক সম্পদ সম্পর্কে ধারণার বিকাশ :- জ্ঞান আজকের শিক্ষার্থী আগামী দিনের দ্বায়িত্বশীল নাগরিক l একজন দ্বায়িত্বশীল নাগরিকের প্রধান দ্বায়িত্ব হল দেশের সামগ্রীক উন্নয়ন সাধন আর এই উন্নয়নের প্রধান ভিত্তি হল সম্পদ উত্তোলন l সম্পদ উত্তোলনের জন্য সম্পদ ও প্রকৃতির অন্তঃসম্পর্ক সমন্ধে ধারণা থাকা জরুরী l প্রাকৃতিক সম্পদের সম্ভাব্য সঞ্চয় ক্ষেত্র, সম্পদের প্রকৃতি ও গুরুত্ব, অর্থনৈতিক উন্নয়নে সম্পদের ভূমিকা সম্পর্কে ধারণা প্রদানে ভূগোল শিক্ষার্থীদের কাছে অনবদ্য বিষয়
অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যৎ সম্পর্কে ধারণা লাভ :- পৃথিবীর উৎপত্তি ,জীবজগতের বিকাশ, মানবীয় সমাজের ক্রম প্রতিপাদন, অর্থনৈতিক-সামাজিক-সাংস্কৃতিক বিকাশের ধারা প্রভৃতি নানা বিষয়ের অতীত-বর্তমান ও ভবিষ্যতের রূপরেখা ও সম্পর্ক সমন্ধে জ্ঞান লাভের জন্য ভূগোল পাঠ আবশ্যক
পরিবেশ সম্পর্কে জ্ঞানলাভ :- পৃথিবীর বর্তমান প্রাকৃতিক পরিবেশ ও তার ভবিষ্যতে পরিবর্তনশীলতা,পরিবেশের উন্নয়ন ও অবনমন, ভূমিরুপের বিকাশ,পরিবেশ দূষণ ও দূষণ রোধের উপায়,দূষণ ও জীবজগতের পরিবর্তিত রুপ, বিশ্ব উষ্ণায়ন প্রভৃতি সম্পর্কে জ্ঞান লাভ ভূগোল শিক্ষার্থী তথা যেকোন শিক্ষার্থী অন্যতম আগ্রহের বিষয় যা ভূগোল শিক্ষার মাধম্যে সম্পূর্ণ হয়
সুষম ব্যক্তিত্বের বিকাশ :- যেকোন শিক্ষার অন্যতম মূল উদ্দেশ্য হল সুষম ব্যক্তিত্বের বিকাশ l যা শিক্ষার্থীর পারিপার্শিক প্রাকৃতিক ও আর্থ-সামাজিক অবস্থা,পরিবেশ সচেতনতা, জীবনধারণের মানোন্নয়ন, জ্ঞানার্জনের কৌতুহল, বিশ্বের আপেক্ষিক পরিকাঠামো ও জনজীবনে তার প্রভাব সম্পর্কে ধারণার ভিত্তিতে গঠিত হয় l যা ভূগোলের এক অন্যতম প্রতিপাদ্য বিষয়
সামাজিকতার বিকাশ :- ভূগোল শিক্ষা দেশপ্রেম জাগরণ ; প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের প্রতি আকর্ষণ ; সহযোগিতা,সমবেদনা ও বিশ্ব ভাতৃত্ব বোধের মনোভাব গঠণ ; দেশ ও মানবজাতির সাপেক্ষে সভ্যতা ও সংস্কৃতির মূল্যায়ন উপলব্ধি প্রভৃতির মাধ্যমে শিক্ষার্থীর অন্তঃকরনে সামাজিকতার বীজ বপনে সাহায্য করে থাকে
ব্যবহারিক দিকের উন্নয়ন :- মানুষ প্রতিনিয়ত ছুটে চলেছে উন্নয়নের পিছনে l এই উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন ব্যবহারিক দক্ষতা যা ভূগোল শিক্ষার মাধ্যমে প্রাপ্ত হয় l ভূমির ব্যবহার, শিল্পের বিকাশ, কৃষিব্যবস্থার উন্নয়ন,পরিবহন, যোগাযোগ ও বাণিজ্য ব্যবস্থার আধুনিকীকরণের সাথে এরুপ উন্নয়ন ওতপ্রোতভাবে জড়িত l আবার উন্নয়নের এইসব উপাদানগুলোর ব্যবহারিক কৌশল সমন্ধে সম্যক ধারণা প্রদান করে ভূগোল শিক্ষা l অর্থাৎ ব্যবহারিক দিকের উন্নয়নে ভূগোল শিক্ষা আবশ্যকীয়

