প্রথম অংশ : বৈদিক যুগের শেষের দিকে, অর্থাৎ খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকে প্রচলিত সামাজিক বৈষম্য, অর্থনৈতিক জটিলতা, রাজনৈতিক অচলাবস্থা ও যজ্ঞকেন্দ্রিক ধর্মমতের বিরুদ্ধে যে যুগােপযােগী ধর্মমতের উদ্ভব ঘটে, তা ভারতের ইতিহাসে প্রতিবাদী আন্দোলন নামে খ্যাত। উল্লিখিত সময় পর্বে ভারতে নাস্তিক ও আস্তিক ধারায় প্রায় ৬৩টি ধর্মমতের উদ্ভব ঘটে, যার মধ্যে জৈন ও বৌদ্ধধর্ম নিম্নলিখিত কারণে সবিশেষ সমাদৃত।
● অর্থনৈতিক কারণ : খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকে কৃষির উন্নতির সাথে সাথে ব্যাবসাবাণিজ্যের দ্রুত প্রসার ঘটতে থাকে। কিন্তু বৈদিক ব্রাত্মণরা সমুদ্রযাত্রা, সুদের কারবার প্রভৃতির ওপর নানানরকম ধর্মীয় বিধিনিষেধ আরােপ করেছিলেন। কিন্তু বৌদ্ধধর্মে এইসব বিষয়ের ওপর কোনাে বিধিনিষেধ ছিল না। এছাড়াও জৈন ও বৌদ্ধধর্মের অহিংসার আদর্শ এবং যুদ্ধের অপ্রয়ােজনীয়তা সম্পর্কিত প্রচারব্যবস্থা বাণিজ্য বিকাশে বিশেষ সহায়ক হয়েছিল। এই জন্যই বৈশ্যরা বৌদ্ধ এবং জৈনধর্মের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়েন।
● সামাজিক কারণ : জটিল ও বৈষম্যপূর্ণ সমাজব্যবস্থা : বৈদিক যুগের শেষের দিকে জাতিভেদ প্রথা সমাজে বিভেদের প্রাচীর গড়ে তুলেছিল।
১) বৈদিক যুগের শেষের দিকে আর্যসমাজ ব্রাত্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য, শূদ্র—এই চারটি শ্রেণিতে বিভক্ত হয়ে পড়ে। শিক্ষাব্যবস্থা ও ধর্মজীবনে ব্রাত্মণদের অবস্থান ছিল শীর্ষে এবং তারা সমাজে বিশেষ সুযােগসুবিধার অধিকারী ছিলেন। ক্ষত্রিয়রা শাসকশ্রেণির মর্যাদায় অধিষ্ঠিত হলেও সামাজিক দিক থেকে তারা ব্রাত্মণদের সমতুল্য ছিলেন না। বৈশ্যদের হাতে অর্থ থাকলেও তাদের তেমন সামাজিক মর্যাদা ছিল না। সমাজে শূদ্রের স্থান ছিল ভৃত্যের মতাে। ক্রমশ ব্রাত্মণ বাদে সমাজের অন্যান্য শ্রেণিরা ব্রাত্মণদের মতাে মর্যাদা ও অধিকারের দাবিদার হয়। এই পরিস্থিতিতে বৌদ্ধ শ্ৰমণরা জাতিভেদহীন সমাজের কথা প্রচার করলে জনসাধারণের অনেকেই এই ধর্মের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়ে।
২) বৈদিকযুগের শেষ দিকে সমাজে নারীদের মর্যাদা অনেকাংশে কমে যায়। আগের মতাে তারা যুদ্ধবিদ্যা বা ধর্মীয় অনুষ্ঠানে যােগ দিতে পারতেন না। এছাড়া বাল্যবিবাহ এবং বহু বিবাহ প্রথা সে যুগের নারীসমাজকে দুর্বল করে তােলে। অপর পক্ষে, বৌদ্ধধর্মের প্রথম যুগে নারীদের পুরুষের সমান অধিকার দেওয়া হয়। ফলে নারীসমাজ বৌদ্ধধর্মের প্রতি সহজেই আকৃষ্ট হয়ে পড়ে।
● ধর্মীয় কারণ : বৈদিক যুগের শেষ ভাগে যাগযজ্ঞ, আড়ম্বর ও পশুবলি ধর্মানুষ্ঠানের প্রধান অঙ্গ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এযুগে যাগযজ্ঞ ছিল অত্যন্ত ব্যয়বহুল, আচার-সর্বস্ব ও সময়সাপেক্ষ। ফলত, আর্থসামাজিক প্রশ্নেই মানুষ বৈদিক ধর্মের প্রতি বিরূপ হয়ে ওঠে।
◆ বৈদিক যাগযজ্ঞের অন্যতম অঙ্গ ছিল আহূতি বা পশুবলি। ক্রমবর্ধমান পশুহত্যার ফলে গাে সম্পদ কমে যাওয়ায় দেশের কৃষি ব্যবস্থাও ক্ষতিগ্রস্থ হয়। এই অবস্থায় বৌদ্ধ ও জৈনধর্মের প্রবক্তারা অহিংসা, জীবে দয়া প্রভৃতি আদর্শ প্রচার করলে তা বহুজনের কাছেই গ্রহণযােগ্য হয়ে ওঠে। এর যথার্থতা খুঁজে পাওয়া যায় ঐতিহাসিক ওডেনবার্গ-এর এই মন্তব্যে, বুদ্ধের আবির্ভাবের শত শত বছর আগেই ভারতীয় চিন্তাধারায় এক আলােড়ন সৃষ্টি করে।
অন্যদিকে বুদ্ধের মহানুভবতা, উজ্জ্বল ব্যক্তিত্ব ও মর্মস্পর্শী উপদেশ বৌদ্ধধর্মের সাফল্যের অন্যতম কারণ। স্বামী বিবেকানন্দের ভাষায়, জন্মলগ্ন থেকেই বুদ্ধ এত পবিত্র, এত নির্মল ছিলেন যে, যে-ই তাঁর শ্রীমুখ দর্শন করেছিল, সে-ই আনুষ্ঠানিক ধর্ম পরিত্যাগ করে সন্ন্যাসধর্ম গ্রহণ করেছিল এবং পরিত্রাণ লাভ করেছিল।
● ভাষাগত কারণ : বৈদিক আর্যদের প্রধান ভাষা ছিল সংস্কৃত। কিন্তু এই ভাষা সাধারণ মানুষের জটিল ও দুর্বোধ্য মনে হত। অপর দিকে বুদ্ধদেব পালি ভাষায় ধর্মপ্রচার করতেন, যা ছিল সর্বসাধারণের সহজবােধ্য।
বৈদিক যুগের শেষের দিকে লােহার আবিষ্কারের ফলে কৃষি, শিল্প এবং ব্যাবসাবাণিজ্যের প্রসার ঘটার সঙ্গে সঙ্গে সমাজে ব্যাপক ধনবৈষম্যের সৃষ্টি হয়। আর্থিক ও সামাজিক দিক থেকে বঞ্চিত মানুষ প্রকৃত সুখের পথ খুঁজতে থাকে। এই সংকট থেকে মুক্তি লাভের জন্য জৈন ও বৌদ্ধধর্মে অত্যধিক ভােগ বিলাস এবং সন্ন্যাস জীবনের পরিবর্তে মধ্যপন্থা গ্রহণের কথা বলা হয়েছে। প্রসঙ্গত ঐতিহাসিক রােমিলা থাপার বলেছেন যে, এই সময়, আর্থসামাজিক জীবনের পরিবর্তনের ফলে ধর্মীয় জীবনেও পরিবর্তন অনিবার্য হয়ে উঠেছিল।
● রাজনৈতিক কারণ ; এই সময়ে রাজার চরম আধিপত্য এবং কঠোর নিয়মকানুন জনগণের স্বাভাবিক গতিকে রােধ করে। অপরদিকে বৌদ্ধ ও জৈনধর্মে রাজতান্ত্রিক আদর্শের বদলে গণতান্ত্রিক ভাবাদর্শের প্রতি বেশি জোর দেওয়া হয়েছিল। তাদের প্রতিষ্ঠিত ধর্ম সংঘগুলি ছিল এক একটি ছােটো ছােটো গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান।
● দার্শনিক চিন্তাভাবনা ; বৈদিক ধর্মমতের প্রচলিত ভ্রান্তনীতির পরিবর্তে এযুগে বুদ্ধি ও আধ্যাত্মিক চেতনার বিকাশ ঘটে। এর ফলস্বরূপ এই সময়ে জন্মান্তর কর্মফল তত্ত্ব প্রভৃতি ধারণাকে নতুনভাবে ব্যাখ্যা করে বলা হয় যে, সকল মানুষকেই কর্মফল ভােগ করতে হবে। এমনকি যাগযজ্ঞ মানুষকে জন্মমৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা করতে পারে না। এর জন্য প্রয়ােজন নৈতিক শুদ্ধতা যা বৌদ্ধধর্মে বারংবার বলা হয়েছে।
● উপসংহার: পরিশেষে একথা বলা যায় যে, ইউরােপে যেমন ক্যাথলিক ধর্ম ও পােগের স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে প্রােটেস্টান্ট ধর্মের উৎপত্তি হয়েছিল, তেমনি ভারতে খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকে বৈদিক ধর্ম ও ব্রাক্ষ্মণদের প্রাধান্যের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী ধর্ম হিসেবে জৈন ও বৌদ্ধধর্মের আবির্ভাব হয়। সে কারণেই স্বামী বিবেকানন্দ বৌদ্ধধর্মকে ‘Rebel child of Hinduism' বলে অভিহিত করেছেন। পরবর্তীকালে এই ধর্ম ভারত তথা এশিয়ার বিভিন্ন দেশে প্রসার লাভ করে।
● দ্বিতীয় অংশ : খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতাব্দীতে সমগ্র প্রাচ্যে যে-সকল মহাপুরুষ জন্মগ্রহণ করেন, গৌতম বুদ্ধ তাদের মধ্যে অন্যতম। তার মহানির্বাণের পর তার শিষ্যরা রাজগৃহে এক ধর্ম সম্মেলনে মিলিত হন এবং তার উপদেশাবলি সংকলন করা হয়। পালি ভাষায় সংকলিত উপদেশ সমূহ ত্রিপিটক নামে পরিচিত। ত্রিপিটকগুলি—সূত্ত পিটক, বিনয় পিটক ও অভিধর্ম পিটক এই তিন অংশে বিভক্ত। এগুলিতে যথাক্রমে বুদ্ধের উপদেশসমূহ, বৌদ্ধ ভিক্ষু ভিক্ষুনীদের পালনীয় বিধিসমূহ ও বৌদ্ধদর্শন লেখা আছে। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, বিনয় পিটকের তুলনায় সূত্র পিটকের মূল্য অনেক বেশি। ঐতিহাসিক রিস জেভিড়স তার Buddhist India' নামক শীর্ষক গ্রন্থে বলেছেন যে, বিনয় পিটকের সকল বক্তব্যই বুদ্ধের নিজস্ব নয়, এর মধ্যে তার শিষ্যদের মতামতেরও সংমিশ্রণ ঘটেছে। তাহলেও বলা যায় যে, ত্রিপিটক হল বৌদ্ধধর্মের একটি আকর গ্রন্থ।
Tags
History
