রাজনীতি বলতে কী বােঝাে? রাজনীতি আলােচনার সনাতন দৃষ্টিভঙ্গি সম্পর্কে আলােচনা করাে।

উত্তর: আধুনিক জীবনের সঙ্গে রাজনীতি অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত।‘রাজনীতি’শব্দটির প্রকৃত অর্থ সম্পর্কে রাষ্ট্রবিজ্ঞানী মহলে মতবিরােধ লক্ষ করা যায়। সাধারণত মনে করা হয় গ্রিক শব্দ ‘Polis' এবং 'Polites থেকেই 'Politics' (রাজনীতি) শব্দটির উদ্ভব হয়েছে। বিখ্যাত গ্রিক দার্শনিক অ্যারিস্টটলের ‘Politics' গ্রন্থে প্রথম এ বিষয়ে বিস্তারিত আলােচনা করা হয়। রাষ্ট্রবিজ্ঞান যেমন গতিশীল বিজ্ঞান, তেমনি রাজনীতির বিষয়বস্তুও সদাপরিবর্তনশীল।
রাজনীতির সংজ্ঞা ও প্রকৃতি : রাজনীতির সংজ্ঞা ও প্রকৃতি সম্পর্কে বিভিন্ন সময় দেশে নানারকম মতামত লক্ষ করা গেছে। রাজনীতির অর্থ ‘রাজার নীতি’ ‘রাষ্ট্রের নীতি’। উদারনৈতিক তাত্ত্বিকদের মতে জনগণের সার্বিক কল্যাণসাধনের উদ্দেশ্যে রাষ্ট্র কর্তৃক যে নীতি গৃহীত বিভিন্ন সনাতন হয়, তা-ই হল রাজনীতি।
সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিতে রাজনীতি : চার্লস মেরিয়াম, গ্রাহাম ওয়ালাস প্রমুখদের মতে সামাজিক প্রেক্ষাপটকে বাদ দিয়ে রাজনীতি সংক্রান্ত আলােচনা সম্পূর্ণতা লাভ করতে পারে না।
মার্কসবাদী দৃষ্টিতে রাজনীতি : মার্কসীয় মত অনুসারে শ্রেণি বিভক্ত সমাজব্যবস্থায় রাজনীতি হল রাষ্ট্রক্ষমতাকে দখল করার জন্য লড়াই। তাই সমন্বয় ও কল্যাণসাধনের পরিবর্তে, দ্বন্দ্ব ও বিরােধই হল মার্কসীয় রাজনীতির মূলকথা।
ব্যাপক অর্থে রাজনীতি: অ্যালান আর. বল, বিসাঞ্জ ও বিসাঞ্জ প্রমুখ রাজনীতিকে একটি প্রক্রিয়া বলে উল্লেখ করেছেন। বিসাঞ্জ ও বিসাঞ্জ ইনট্রোডাকশন টু সােশিয়ােলজি’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, রাজনীতি হল বিরােধ ও মীমাংসার সূত্রস্বরূপ। এ ছাড়াও জিওফ্রে কে. রবার্টস, বারট্রাম লাথাম প্রমুখ রাষ্ট্রবিজ্ঞানীগণও রাজনীতিকে একটি বিশেষ সামাজিক প্রক্রিয়া বলে মন্তব্য করেছেন।
সবশেষে বলা যায়, রাজনীতি একটি সামাজিক বা গােষ্ঠীগত প্রক্রিয়া। রাজনীতি কখনও একা পরিচালনা করা যায় না। রাজনীতির মূল বিষয় হল ক্ষমতা।
■ সনাতন রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি : অ্যালান আর. বল সাবেকি বা সনাতন দৃষ্টিভঙ্গি বলতে যা বলতে চেয়েছেন তা হল 1900 খ্রিস্টাব্দের আগে পর্যন্ত রাষ্ট্রবিজ্ঞান আলােচনার ক্ষেত্রে যে বিষয়গুলি বিশেষভাবে অনুসরণ করা হত, তা হল—
1) দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গি, 
2) ঐতিহাসিক দৃষ্টিভঙ্গি 
3) আইনগত দৃষ্টিভঙ্গি।
1) দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গি : সনাতন দৃষ্টিভঙ্গির সবচেয়ে প্রাচীন দৃষ্টিভঙ্গি হল দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গি। এই দৃষ্টিভঙ্গির প্রবক্তা হলেন লক্, রুশাে, প্লেটো, হেগেল, অ্যারিস্টটল প্রমুখ দার্শনিক। এই দৃষ্টিভঙ্গির প্রবক্তাগণ রাজনৈতিক বাস্তবতা অপেক্ষা কল্পনাপ্রসূত চিন্তা ও পূর্ব নির্ধারিত সিদ্ধান্তের মাধ্যমে পরিচালিত হয়ে রাজনৈতিক সমস্যা আলােচনায় মনােনিবেশ করতেন। এঁদের লক্ষ্য ছিল রাষ্ট্র এবং মানবজীবনের রাজনৈতিক মূল্যবােধ নির্ধারণ করা।
2) ঐতিহাসিক দৃষ্টিভঙ্গি : এই দৃষ্টিভঙ্গিতে ঐতিহাসিকগণ দার্শনিকদের অনুকরণ করেন না, ফলে তাঁরা পূর্ব অনুমানের ভিত্তিতে কোনাে সিদ্ধান্ত নেন না। তাদের মুখ্য উদ্দেশ্য হল রাজনৈতিক জীবনের এক ধারাবাহিক ইতিহাস রচনা করা। স্যাবাইনের মতে, ইতিহাসকে বাদ দিলে রাষ্ট্রতত্ত্বের আলােচনা অসম্পূর্ণ থাকে। হেগেল, কার্ল মার্কস প্রমুখ তাত্ত্বিক তাদের রাষ্ট্রতত্ত্বের আলােচনায় ঐতিহাসিক পদ্ধতি প্রয়ােগ করেছেন।
3) আইনগত দৃষ্টিভঙ্গি : হেনরি মেইন, এ. ভি. ডাইসি, মেল্যান্ড প্রমুখ আইনগত দৃষ্টিভঙ্গির প্রবক্তাগণ সাধারণত সরকারের বিভিন্ন বিভাগের আইনগত কাঠামাে ও কার্যাবলি প্রভৃতির মধ্যে তাঁদের আলােচনাকে সীমাবদ্ধ রাখতে চেয়েছেন। রাষ্ট্রের আইন, সরকার প্রভৃতি যে অর্থনৈতিক ও সামাজিক ব্যবস্থার ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে, এই দৃষ্টিভঙ্গির প্রবক্তাগণ তার ওপর গুরুত্ব আরােপ করতে চাননি।
পরিশেষে বলা যায়, রাজনীতি আলােচনার ক্ষেত্রে সনাতন দৃষ্টিভঙ্গির গুরুত্বকে অস্বীকার করা যাবে । কারণ সনাতন দৃষ্টিভঙ্গির ওপর নির্ভর করেই আধুনিক রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিসমূহ প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে। 

Lob (Admin)

This site was launched on March 1, 2019. Today it is appreciated by millions of students. This site has changed a lot in the last two years and I have tried to do better every time.

Please Do Not Enter Any Span Link in The Comment Box

Previous Post Next Post

نموذج الاتصال