সম্রাট আকবরের রাজপুত নীতি ও তার ফলাফল
ভূমিকা – মুঘল সম্রাট আকবরের কূটনৈতিক বিচক্ষণতার
শ্রেষ্ঠ পরিচয় ছিল তার রাজপুত নীতি। এই নীতির সাহায্যে মোঘল সাম্রাজ্যের ভিত্তি দৃঢ়
হয় সেটি হল রাজপুত নীতি। ভারতীয় শৌর্যবীর্যের প্রতীক রাজপুতদের সঙ্গে সম্রাট আকবর
মৈত্রীর সম্পর্ক তৈরি করতে সচেষ্ট ছিলেন। রাজপুতরাও মুঘল সাম্রাজ্যের শক্তিস্তম্ভে
পরিণত হয়েছিল।মুঘল শক্তি ছিল ভারতে আগন্তুক।
তাই ভারতবাসীরা মুঘলদের বিদেশি আক্রমণ কারী এবং আফগানদের ভারতীয় বলে মনে করত।
আর আফগান শক্তি ছিল মুঘলের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী। শের শাহের মৃত্যুর পর আকবর শক্তি দুর্বল হয়ে পরলো
প্রাদেশিক স্তরে আফগানরা তখনও শক্তিশালী ছিল। তাছাড়া আকবরের অধীনস্থ সেনাপতিরা তার
প্রতি যথেষ্ট অনুগত ও দায়িত্বশীল ছিল না। সুযোগ পেলেই বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করত। আর সেই
সময় রাজপুতরা ছিল ভারতের শ্রেষ্ঠ সামরিক জাতি।
তাই তিনি উপলব্ধি করেন যে মুঘল সাম্রাজ্যের নিরাপত্তার জন্য এবং পশ্চিম ও দক্ষিণ
ভারতে মুঘল প্রভুত্ব সুদৃঢ় করার জন্য রাজপুতদের সহযোগিতা ও মৈত্রীর লাভ করা প্রয়োজন।
সুতরাং তিনি প্রথমে বন্ধু ভাবে তাদের আনুগত্য লাভের সচেষ্ট হয় যেমন –
রাজপুতদের সম্পর্কে আকবরের গৃহীত নীতি সমূহ : রাজপুতদের উপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য সম্রাট আকবর কয়েকটি নীতি অনুসরণ
করেছিলেন। যেমন—বৈবাহিক সম্পর্কের
নীতি, উচ্চ রাজপদে নিয়োগের নীতি, বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা প্রদানের নীতি এবং যুদ্ধনীতি।
১. বৈবাহিক সম্পর্ক - প্রথমেই আকবর রাজপুত বংশ গুলির সঙ্গে বৈবাহিক শক্তির মাধ্যমে মিত্রতা স্থাপনে উদ্যোগী হন। তিনি ১৫৬২ সালে জয়পুরের রাজা বিহারীমলের কন্যাকে বিয়ে করেন। তারপর ১৫৭০ সালে তিনি বিকানির রাজ্যের রাজকন্যাকে বিয়ে করেন। তারপর রাজা ভগবান দাসের কন্যার সঙ্গে নিজের পুত্র সেলিমের বিয়ে দেন।
২. রাজপদে নিয়োগ - সামরিক
ও অসামরিক বিভাগের উচ্চ রাজপদে ও মনসবদার পদে নিয়োগ করে তিনি রাজপুতদের অকুণ্ঠ সমর্থন
ও সহযোগিতা লাভ করেন। বিহারীমলের পুত্র ও পৌত্রী
যথাক্রমে ভগবান দাস ও মানব সিংহকে ৫ ও ৭ হাজারী মনসবদারের পদমর্যাদা দেওয়া হয়। রাজপুত রাজাদের আস্থা অর্জনের জন্য তিনি গুজরাট
অভিযানের সময় বিহারীমলকে আগ্রার নিরাপত্তার দায়িত্ব দেন।
৩. বশ্যতা স্বীকার - আকবর রাজপুতদের থেকে
জিজিয়া ও তীর্থকর তুলে দেন। তিনি রাজপুত রাজাদের বশ্যতা স্বীকারের পরিবর্তে স্বায়ত্ত
শাসন এর অধিকার দেন। এছাড়া টোডরমল, বীরবল
প্রভৃতি ছিলেন তার রাজপুত সভাসদ। টোডরমল একধারে ছিলেন সুদক্ষ সেনাপতি ও রাজস্ব বিশারদ।
এছাড়া রাজপুত কবি, শিল্পী, চিত্রকর তার রাজসভা অলংকৃত করেন। ডক্টর বেনি প্রসাদ বলেন যে – বৈবাহিক নীতি ভারতের
রাজনীতিতে এক নতুন যুগের সূচনা করে। এইভাবে এক একে এক মাত্র মেবার ছাড়া প্রায় সব
রাজ্যই তার বশ্যতা স্বীকার করে নেয়।
বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা প্রদান নীতি : রাজপুতদের
সাহায্য ও সহযোগিতা লাভের জন্য আকবর তাদের উপর থেকে তীর্থকর বা জিজিয়া কর তুলে দেন
এবং তাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার সিদ্ধান্ত নেন।
যুদ্ধনীতি : অনেক রাজপুত রাজ্য আকবরের বশ্যতাস্বীকার
করলেও মেওয়াড়, রণথম্ভোর প্রভৃতি রাজ্তপুত যোধাবাঈ রাজ্যগুলি কোন ভাবেই আকবরের বশ্যতাস্বীকার
করতে রাজি হয়নি। তাই আকবর মেওয়াড়ের বিরুদ্ধে যুদ্ধনীতি অনুসরণ করেন। মেওয়াডের রানা
উদয় সিংহ ও তাঁর পুত্র রানা প্রতাপ সিংহ আকবরের বিরুদ্ধে বীরবিক্রমে যুদ্ধ করেন। রানা
প্রতাপ সিংহ ১৫৭৬ খ্রিস্টাব্দে হলদিঘাটির যশ্বে আকবরের বাহিনীর হাতে পরাজিত হলেও তার
বশ্যতাস্বীকার করেননি। আকবর মৈত্রী ও যুদ্ধনীতি অনুসরণ করে রাজপুতদের নিজ নিয়ন্ত্রণে
রাখতে সক্ষম হন এবং মুঘল সাম্রাজ্যের ভিত সুদৃঢ় হয়।
আকবরের রাজপুত নীতির ফলাফল
ভূমিকা – ডঃ বেনীপ্রশাদ তার ” হিস্টরি অফ জাহাঙ্গীর ” গ্রন্থে আকবরের রাজপুত নীতির ফলাফল সম্বন্ধে যথার্থই মন্তব্য করেছেন যে, আকবরের রাজপুত নীতির ফলে মোগল রাজবংশের চার প্রজন্মের জন্য মধ্যযুগের শ্রেষ্ঠ সেনাপতি ও কূটনীতিবিদদের সাহায্য সম্ভব হয়। নিম্নে আকবরের রাজপুত নীতির ফলাফল আলোচনা করা হলো –
মোগল
সাম্রাজ্যের সুদৃঢ়করণ - যে রাজপুতরা সাড়ে তিনশো বছরের অধিককাল ধরে সুলতানি শাসনের
বিরুদ্ধে সংগ্রাম চালিয়ে ছিল, তারাই আকবরের মিত্র হয়ে মোগল সাম্রাজ্যের অন্যতম প্রধান
স্তম্ভে পরিণত হয়। রাজপুতদের আনুগত্য লাভ
এর ফলে কেবলমাত্র রাজপুতনাতেই শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়নি, মোগল সাম্রাজ্যের সুদৃঢ়করণ
ও বিস্তৃতির পক্ষেও তা যথেষ্ট সহায়ক হয়।
সামরিক বাহিনীর উন্নতি - রাজপুত মৈত্রীর ফলে মোগল সামরিক বাহিনীও শক্তিশালী
হয়ে ওঠে। মোগল রণনীতি ও রাজপুত রণনীতির সংমিশ্রণে বাদশাহি রণনীতি উন্নততর হয়ে ওঠে।
আর্থিক উন্নতি - রাজপুত নীতি সাম্রাজ্যের আর্থিক
উন্নতির পক্ষে যথেষ্ট সহায়ক হয়। পশ্চিম উত্তর-পশ্চিম
ভারতের সঙ্গে দেশের অন্যান্য অঞ্চলের বাণিজ্য চলত রাজপুতানার মধ্য দিয়ে। রাজপুতানার ওপর মোগল কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হওয়ার
ফলে ব্যবসা-বাণিজ্য সহজতর হয়। মারওয়ারের
ওপর মোগল কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হলে যোধপুরের মধ্য দিয়ে গুজরাটের সঙ্গে যোগাযোগ, ব্যবসা-বাণিজ্য
বা সেখানে সামরিক অভিযান প্রেরণ সহজতর হয়ে ওঠে।
নবযুগের সূচনা - আকবরের রাজপুত নীতি হিন্দু মুসলিম
ঐক্য এবং ভারতের সাংস্কৃতিক জীবনে এক নবযুগের সূচনা করে। বহু রাজপুত কবি-সাহিত্যিক, শিল্পী, চিত্রকর আকবরের
রাজসভা অলংকৃত করতেন। এর ফলে স্থাপত্য, ভাস্কর্য, সংগীত সর্বক্ষেত্রে হিন্দু-মুসলিম
সমন্বয় পরিলক্ষিত হয়।
রাজপুতদের ওপর প্রভাব - আকবরের এই নীতির ফলে রাজপুতরাও কম লাভবান হইনি। ১. আকবরের আনুগত্য মেনে নিয়ে রাজপুত রাজারা নিজনিজ
রাজ্যে নির্বিঘ্নে ও স্বাধীনভাবে রাজত্ব করার সুযোগ পান। ২. আনুগত্য ও কর্মদক্ষতার স্বীকৃতিস্বরুপ রাজপুত
রাজন্যবর্গ বাদশাহি দরবারে নানা গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক পদে নিযুক্ত হন। অম্বরের ভগবান
দাস লাহোরে যুগ্ম শাসক নিযুক্ত হন। মানসিংহ
প্রথমে কাবুল ও পরে বাংলা বিহারের শাসনকর্তা নিযুক্ত হন।

