উত্তরঃ বর্তমানে রাষ্ট্রবিজ্ঞানকে বিজ্ঞান বলে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। রাষ্ট্রবিজ্ঞান যদিও রসায়ন বা জীবনবিজ্ঞানের মতাে বিশুদ্ধ বিজ্ঞান নয়। তাই বলা হয়, প্রকৃতিগত দিক থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বা রাজনীতি সমাজবিজ্ঞানের একটি অগ্রবর্তী শাখা। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের প্রকৃতি, পরিধি বা বিষয়বস্তু নিয়ে নানা মত ও তত্ত্ব আছে। আবার এইসব তত্ত্ব বর্তমান যুগের সঙ্গে পরিবর্তিত হচ্ছে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানকে তাই গতিশীল সমাজবিজ্ঞান বলা হয়। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের গতিশীল প্রকৃতির জন্য এর প্রকৃতি ও বিষয়বস্তুর পরিধির পরিবর্তন ঘটেছে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের পরিধি নিয়ে বিতর্ক ও বিরােধের অবসান সম্ভব হয়নি। মূলত দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্য এবং সমাজবিজ্ঞানের প্রভাবের জন্য এই মতভেদ দেখা যাচ্ছে।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানের বিষয়বস্তু নিয়ে বিভিন্ন রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের মধ্যে মতপার্থক্যের জন্য রাষ্ট্রবিজ্ঞানের বিষয়বস্তুগুলিকে কয়েকটি ভাগে ভাগ করা যায়। তা হল- (a) রাষ্ট্রকেন্দ্রিক বিষয়বস্তু, (b) আধুনিক বিষয়বস্তু, (c) মার্কসীয় বিষয়বস্তু, (d) ইউনেস্কোর সিদ্ধান্ত এবং (e) অতিসাম্প্রতিক পরিধি।
(a) রাষ্ট্রকেন্দ্রিক বিষয়বস্তু : রাষ্ট্রকেন্দ্রিক আলােচনাকে শুধু সনাতনী রাষ্ট্রবিজ্ঞানী নন, অনেক আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরাও গুরুত্ব দিয়েছেন। কারণ, রাষ্ট্র ও রাজনীতি ওতপ্রােতভাবে জড়িত। রাষ্ট্রকেন্দ্রিক আলােচনায় কয়েকটি বিষয়কে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। এগুলি হল—রাষ্ট্র, সরকার, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, রাজনৈতিক ক্ষমতা, নৈতিকতা, আইন প্রভৃতি। রাষ্ট্রবিজ্ঞানে বিষয়বস্তুর কেন্দ্রে আছে রাষ্ট্র। আর রাষ্ট্রের ধারণাটিকে বাস্তবায়িত করে সরকার। কোনাে রাষ্ট্র অন্য কোনাে রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক রেখে টিকে থাকতে পারে না, ফলে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিষয়টি প্রাধান্য পেয়েছে। রাজনৈতিক ক্ষমতা রাষ্ট্রবিজ্ঞানের আলােচনার গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। রাষ্ট্র যেহেতু আইনানুগভাবে গঠিত সামাজিক প্রতিষ্ঠান তাই আইন বিষয়টি রাষ্ট্রবিজ্ঞানের আলােচনায় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বলে বিবেচিত হয়েছে।
(b) আধুনিক বিষয়বস্তু : রাষ্ট্রবিজ্ঞানের পরিধি হিসেবে রাষ্ট্রকেন্দ্রিক বিষয়বস্তুর প্রাধান্য এতকাল চলে এসেছে। কিন্তু বর্তমানে আধুনিক লেখক, রাষ্ট্রবিজ্ঞানীগণ, সরকার ছাড়াও নানা প্রতিষ্ঠান ও বিষয়কে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে গ্রহণ করেছেন। আধুনিক মতবাদে বিশ্বাসী বিশিষ্ট রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের মধ্যে উল্লেখযােগ্য হলেন গ্রাহাম ওয়ালাস, আর্থার বেন্টলে, রবার্ট ডাল প্রমুখ। তাঁদের মত অনুসারে রাষ্ট্রকেন্দ্রিক বিষয়গুলি ছাড়াও রাষ্ট্রবিজ্ঞানের মূল বিষয়বস্তু হল—
1) ব্যক্তির রাজনৈতিক আচরণ।
2) স্বার্থগােষ্ঠী, রাজনৈতিক দল প্রভৃতির প্রকৃতি, কার্যাবলি ও সমাজের ভূমিকা।
3) ব্যক্তি ও গােষ্ঠীর মধ্যে বিরােধ, দ্বন্দ্ব, সংঘাত এবং তার মীমাংসা।
4) ক্ষমতা ও ক্ষমতাকেন্দ্রিক দ্বন্দ্ব।
5) বিভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শ ও তত্ত্ব।
(c) মার্কসীয় বিষয়বস্তুঃ মার্কসীয় মতবাদ রাষ্ট্রবিজ্ঞানের বিষয়বস্তু হিসেবে সবচেয়ে গুরুত্ব দিয়েছে শ্রেণি ও শ্রেণিদ্বন্দুকে। মার্কসীয় মতানুসারে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের পরিধির অন্তর্ভুক্ত বিষয়গুলি হল— 1) বিভিন্ন জাতির মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক এবং তার প্রভাব ও ফলাফল।
2) বিভিন্ন সামাজিক এবং রাজনৈতিক গােষ্ঠী ও দলের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক।
3) এক বা একাধিক রাষ্ট্রের সঙ্গে পারস্পরিক সম্পর্ক। অর্থাৎ, আন্তর্জাতিক সম্পর্ককে মার্কসবাদীগণ রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অন্যতম বিষয়বস্তু হিসেবে স্বীকার করেন।
(d) ইউনেস্কোর সিদ্ধান্ত : 1948 খ্রিস্টাব্দের সেপ্টেম্বর মাসে ইউনেস্কো (UNESCO) একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলন আহ্বান করে। প্যারিসে অনুষ্ঠিত The International Political Science Conference-এ প্রায় সর্বসম্মতিক্রমে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের যে বিষয়বস্তুর পরিধি নির্দিষ্ট করা হয়, তা হল ---
1) রাজনৈতিক তত্ত্ব ও রাজনীতি।
2) রাজনৈতিক শাসন, সুরকার, প্রশাসন প্রভৃতি। 3) আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, আন্তর্জাতিক আইন প্রভৃতি।
4) রাজনৈতিক দল, রাজনৈতিক গােষ্ঠী, স্বার্থগােষ্ঠী ও জনমত প্রভৃতি।
(e) অতিসাম্প্রতিক পরিধি : রাষ্ট্রবিজ্ঞানের পরিধি পরিবর্তনশীল। আসলে গতিশীল কোননা শাস্ত্রের পরিধিকে সীমাবদ্ধ করা যায় না। এই কারণে আধুনিক মতবাদের পরও ‘উত্তর আধুনিক চিন্তার আবির্ভাব হয়। এক্ষেত্রে নয়া-উদারনীতিবাদ, উত্তর আচরণবাদ, নয়া মার্কসবাদ প্রভৃতি তত্ত্বের অবদান উল্লেখযােগ্য। সাম্প্রতিক বিষয়বস্তুর ব্যাপারে যেসব রাষ্ট্রবিজ্ঞানীর নাম উল্লেখ্য, তাঁদের অন্যতম হলেন মাইকেল কার্টিস, জন রল, এরিক হবসম প্রমুখ।
পরিশেষে বলা যায়, রাষ্ট্রবিজ্ঞানের বিষয়বস্তুকে কোনাে সীমারেখা দ্বারা নির্দিষ্ট করে রাখা যায় না। পরিবর্তনশীল আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি, নিত্য নতুন তত্ত্বের উদ্ভব, বিশ্বায়নের প্রভাব রাষ্ট্রবিজ্ঞানের আলােচনার পরিধি ও বিষয়বস্তুকে ক্রমশ প্রসারিত করে চলেছে।
Tags
Political Science

