উঃ রাষ্ট্রের সৃষ্টি এবং রাষ্ট্র’ শব্দটি নিয়ে যথেষ্ট বিতর্ক লক্ষ করা যায়। রাষ্ট্রের সংজ্ঞা নিয়েও বিতর্কের সীমা নেই। বিভিন্ন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী বিভিন্ন রকমের সংজ্ঞা দিয়েছেন। এ প্রসঙ্গে গিলক্রিস্ট বলেছেন রাষ্ট্র নিয়ে যতরকমের বই আছে প্রায় ততরকমের সংজ্ঞা লক্ষ করা যায়। ডেভিড ইস্টন প্রদত্ত তথ্য থেকে জানা যায় যে, রাষ্ট্রের প্রায় 145টি সংজ্ঞা রয়েছে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী সুজে বলেছেন, আজ পর্যন্ত যত রাষ্ট্রবিজ্ঞানী রাষ্ট্রের সংজ্ঞা দিয়েছেন, তাঁদের কারও সংজ্ঞার সঙ্গে কারওর সংজ্ঞার কোনাে মিল নেই। বিভিন্ন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী প্রদত্ত রাষ্ট্রের সংজ্ঞাগুলির মধ্যে কয়েকটি নীচে উল্লেখ করা হল ----
প্রাচীন গ্রিক দার্শনিক অ্যারিস্টটলের মতে, স্বয়ংসম্পূর্ণ, সুখী ও সম্মানজনক জীবনযাপনের লক্ষ্যে সংগঠিত কয়েকটি পরিবার ও গ্রামের সমষ্টিই হল রাষ্ট্র। বুন্টসলির মতে, সংক্ষেপে রাষ্ট্র হল একটি নির্দিষ্ট ভূখণ্ডে রাজনৈতিকভাবে সংগঠিত জনসমষ্টি (The state is the politically organised people of a definite territory.)। অধ্যাপক ল্যাস্কির মতে, রাষ্ট্র হল একটি ভৌগােলিক সমাজ যা সরকার ও শাসিতের মধ্যে বিভক্ত এবং যেখানে শাসক তার জন্য নির্দিষ্ট এলাকার মধ্যে অন্যান্য সকল প্রতিষ্ঠানের ওপর নিজের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে। ল্যাসওয়েল ও ক্যাপলানের মতবাদও এ প্রসঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ। এঁদের মতে, রাষ্ট্র হল একটি সার্বভৌম ভৌগােলিক গােষ্ঠী (Sovereign territorial group)।
তবে গঠনগত বৈশিষ্ট্যের নিরিখে অধ্যাপক জেমস্ উইলফোর্ড গার্নার (James Wilford Garner) প্রদত্ত সংজ্ঞাটিই হল সর্বোৎকৃষ্ট। কারণ, গার্নার প্রদত্ত রাষ্ট্রের সংজ্ঞায় রাষ্ট্রের সকল বৈশিষ্ট্যগুলি প্রকাশ পেয়েছে। অধ্যাপক গার্নার রাষ্ট্র সম্পর্কে যে সংজ্ঞা দিয়েছেন তা হল সম্পূর্ণ, সবচেয়ে গ্রহণযােগ্য ও জনপ্রিয়। তিনি বলেন, রাষ্ট্র হল কমবেশি বহু সংখ্যক মানুষ নিয়ে সংগঠিত জনসমাজ যারা নির্দিষ্ট ভূখণ্ডে স্থায়ীভাবে বাস করে, যারা স্বাধীন এবং বহিঃশক্তির নিয়ন্ত্রণ থেকে সম্পূর্ণভাবে মুক্ত এবং যাদের একটি সুসংগঠিত সরকার আছে, যে সরকারের প্রতি অধিকাংশ অধিবাসী স্বাভাবিক আনুগত্য প্রদর্শন করে। এই সংজ্ঞার মধ্যে আধুনিক রাষ্ট্রের সকল উপাদানই বর্তমান।
■ রাষ্ট্রের প্রধান বৈশিষ্ট্য বা উপাদান : গার্নার প্রদত্ত সংজ্ঞা অনুসারে রাষ্ট্রের প্রধান ও অপরিহার্য চারটি বৈশিষ্ট্য হল—
(1) জনসমষ্টি,
(2) নির্দিষ্ট ভূখণ্ড,
(3) সরকার ও
(4) সার্বভৌমত্ব।
তবে এ প্রসঙ্গে বলা দরকার আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের সংজ্ঞার আলােচনায় আরও তিনটি বৈশিষ্ট্য লক্ষ করা যায়। তাহল—
(5) স্থায়িত্ব,
(6) আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি,
(7) জাতীয়তাবাদ।
এর মধ্যে প্রথমােক্ত চারটি উপাদান হল রাষ্ট্রের অপরিহার্য বা আবশ্যিক উপাদান, কিন্তু শেষােক্ত তিনটি উপাদান রাষ্ট্র গঠনের ক্ষেত্রে অপরিহার্য ও আবশ্যিক নয়। সুতরাং, বলা যেতে পারে সব মিলিয়ে রাষ্ট্রের বৈশিষ্ট্য বা উপাদান হল সাতটি। নীচে বৈশিষ্ট্যগুলি আলােচনা করা হল—
1) জনসমষ্টি : রাষ্ট্রের প্রধান বৈশিষ্ট্য বা উপাদান হল জনসমষ্টি বা জনগণ। মানববিহীন কোনাে ভূখন্ডে রাষ্ট্র গড়ে উঠতে পারে না। তাই জনসমাজ বা জনসমষ্টি ছাড়া রাষ্ট্র গঠিত হয় না। তবে জনসমষ্টির আয়তন বা সংখ্যা কত হবে এ বিষয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের মধ্যে যথেষ্ট বিতর্ক লক্ষ করা যায়। অ্যারিস্টটল, রুশাে প্রমুখ রাষ্ট্রবিজ্ঞানীগণ কম জনসংখ্যাবিশিষ্ট রাষ্ট্রের সমর্থক ছিলেন। তারা মনে করতেন দশ হাজার হচ্ছে একটি রাষ্ট্রের পক্ষে আদর্শ জনসংখ্যা। আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা জনগণের সংখ্যা নয় জনগণের ওপর গুরুত্ব দিতে চেয়েছিলেন। জনসংখ্যা বেশি হলে খাদ্য, কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা মুশকিল হয়ে পড়বে। তবে জনগণের মধ্যে শিক্ষার বিস্তার, দেশাত্মবােধ জাগরণের বিশেষ দরকার। অদক্ষ ও অলস জনগণ রাষ্ট্রের পক্ষে অভিশাপ স্বরূপ। আধুনিক রাষ্ট্রে জনসমাজকে তিন ভাগে ভাগ করা যায়— (a) নাগরিক, (b) বিদেশি ও (c) প্রজা।
2) নির্দিষ্ট ভূখণ্ড : রাষ্ট্রের প্রধান বৈশিষ্ট্যের অন্যতম হল নির্দিষ্ট ভূখণ্ড বা নির্দিষ্ট সীমারেখা। রাষ্ট্রের সীমারেখা বলতে বােঝায় সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রের স্থলভাগ, জলভাগ, গাগনিক সীমারেখা প্রভৃতিকে। সমুদ্র উপকূলবর্তী অঞ্চলে কতটা এলাকা কোনাে একটি রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণাধীন থাকবে সে বিষয়ে বিতর্ক থাকলেও সম্মিলিত জাতিপুঞ্জে প্রায় 19 কিলােমিটারের কথা বলা আছে। রুশশা ছিলেন ক্ষুদ্র আয়তনযুক্ত রাষ্ট্রের সমর্থক। অপরদিকে ট্রিটকে ছছাটো রাষ্ট্রকে ‘পাপের প্রতীক বলে মনে করতেন। তবে সাম্প্রতিক বিশ্বায়নের যুগে রাষ্ট্রের আয়তন খুব একটা গুরুত্বপূর্ণ নয়।
3) সরকার: রাষ্ট্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য বা উপাদান হল সরকার। সরকার ছাড়া রাষ্ট্র চলে না। উইলােবর মতে, রাষ্ট্র তার ইচ্ছাকে সরকারের মাধ্যমে বাস্তব রূপ দিতে পারে। সরকার মূলত তিনটি বিভাগ নিয়ে গঠিত, যথা—আইনবিভাগ, শাসনবিভাগ ও বিচারবিভাগ। সরকারের দক্ষতার উপর রাষ্ট্রের উন্নয়ন নির্ভর করে। সরকার সদাপরিবর্তনশীল; কিন্তু রাষ্ট্র স্থায়ী। দেশকাল ভেদে সরকারের ধরন পরিবর্তিত হতে পারে।
4) সার্বভৌমত্ব : সার্বভৌমত্ব রাষ্ট্রের অপরিহার্য উপাদান বা বৈশিষ্ট্য। গার্নার সার্বভৌমত্বকে রাষ্ট্রের আধ্যাত্মিক উপাদান বলে উল্লেখ করেছেন। সার্বভৌম ক্ষমতা হচ্ছে রাষ্ট্রের প্রাণ! সার্বভৌমত্ব দু-প্রকারের হয়, যথা—
(a) অভ্যন্তরীণ ও
(b) বাহ্যিক।
অভ্যন্তরীণ সার্বভৌমত্ব বলতে বােঝায় রাষ্ট্র তার সীমারেখার মধ্যে চূড়ান্ত ক্ষমতার অধিকারী। বাহ্যিক সার্বভৌমত্ব বলতে বােঝায় অন্য রাষ্ট্রের বা বাইরের কোনাে শক্তির নিয়ন্ত্রণ থেকে মুক্তি। কিন্তু এই সার্বভৌমত্ব অনেকাংশে সীমাবদ্ধ। বিভিন্ন প্রথা, রীতিনীতি দ্বারা অভ্যন্তরীণ সার্বভৌমিকতা এবং আন্তর্জাতিক আইন দ্বারা বাহ্যিক সার্বভৌমিকতা নিয়ন্ত্রিত হয়।
5) স্থায়িত্ব : স্থায়িত্ব রাষ্ট্রের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। যে রাষ্ট্রের স্থায়িত্ব নেই তাকে রাষ্ট্র বলে স্বীকার করা যায় না। মার্কসবাদীরা মনে করেন রাষ্ট্র কখনােই চিরস্থায়ী বা শাশ্বত প্রতিষ্ঠান নয়। অতীতে দেখা গেছে বহু রাষ্ট্র ভেঙে নতুন নতুন রাষ্ট্র তৈরি হয়েছে। সুতরাং, স্থায়িত্বের দরকার আছে; কিন্তু তা আবশ্যিক নয়।
6) আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি: রাষ্ট্রের প্রথমােক চারটি উপাদান বা বৈশিষ্ট্য ছাড়াও রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা রাষ্ট্রে অন্যতম বৈশিষ্ট্য হিসেবে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিকে গুরুত্ব দিয়েছেন। এই বৈশিষ্ট্যটি নিয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞানী মহলে যথেষ্ট বিতর্ক লক্ষ করা যায়। কারণ এই বিষয়টি বিশ্বরাজনীতি দ্বারা নির্ধারিত হয়। তবে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ছাড়াও রাষ্ট্রের অস্তিত্ব সম্ভব।
7) জাতীয়তাবাদ : জাতীয়তাবাদ রাষ্ট্রের একটি প্রয়ােজনীয় উপাদান। কারণ জাতীয়তাবাদ ছাড়া জাতি গঠিত হয় না। বৃহৎ বহুজাতিক রাষ্ট্র এবং বিশ্বায়নের যুগে জাতীয়তাবাদকে সংকীর্ণ মানসিকতাই বলা হয়। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, জাতি ও রাষ্ট্র অভিন্ন নয় ।
Tags
Political Science
