উঃ সমাজে বিভিন্ন সামাজিক প্রতিষ্ঠান থাকে। রাষ্ট্রও একটি সামাজিক প্রতিষ্ঠান। ম্যাকাইভারের মতে, অন্যান্য সংঘ হল কিছু মানুষের সংগঠন যা বিশেষ উদ্দেশ্যসাধনে গঠিত হয়। রাষ্ট্র ও অন্যান্য সংঘের মধ্যে কিছু সাদৃশ্য থাকলেও কিছু বৈসাদৃশ্যও লক্ষ করা যায়, যা নীচে আলােচনা করা হল ---
1) উৎপত্তিগত পার্থক্য : রাষ্ট্র ও অন্যান্য সংঘের মধ্যে উৎপত্তিগত কিছু পার্থক্য লক্ষ করা যায়। হাজার হাজার বছরের দীর্ঘ বিবর্তনের ফলে রাষ্ট্রের উৎপত্তি হয়েছে। কিন্তু অন্যান্য সংঘ প্রতিষ্ঠানের জন্য এত দীর্ঘ পরিবর্তনের দরকার হয় না। সামাজিক মানুষ ইচ্ছা করলেই অন্যান্য সংঘ তৈরি করতে পারে। কিন্তু ইচ্ছানুসারে রাষ্ট্র তৈরি সম্ভব নয়।
2) ভূখণ্ডগত পার্থক্য : রাষ্ট্র ও অন্যান্য সংঘের মধ্যে সীমারেখাগত পার্থক্য লক্ষ করা যায়। রাষ্ট্রের নির্দিষ্ট ভূখণ্ড বা সীমানা থাকে। কিন্তু অন্যান্য সংঘের কোনাে নির্দিষ্ট সীমারেখা থাকে না। এই সমস্ত সংঘ দেশ জুড়েও থাকতে পারে আবার দেশের বাইরেও থাকতে পারে। যেমন রামকৃয় মিশন, রেডক্রস ইত্যাদি।
3) নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্র : রাষ্ট্র প্রয়ােজনে অন্যান্য সংঘগুলিকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। কিন্তু সংঘ
রাষ্ট্রকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। তাই রাষ্ট্রকে সর্বোচ্চ প্রতিষ্ঠান বলা হয়।
4) সার্বভৌম ক্ষমতার পার্থক্য : রাষ্ট্রের সার্বভৌম ক্ষমতা থাকবেই। কিন্তু অন্যান্য সংঘের কোনাে সার্বভৌম ক্ষমতা নেই। সার্বভৌম ক্ষমতার দ্বারা রাষ্ট্র সদস্যকে চরম শাস্তি এমনকি মৃত্যুদণ্ড দিতে পারে। অন্যান্য সংঘ বড়ােজোর সেই সদস্যকে সংঘ থেকে বহিষ্কার করতে পারে বা সদস্যপদ কেড়ে নিতে পারে।
5) উদ্দেশ্যগত পার্থক্য: দেশবাসীর সার্বিক মঙ্গলসাধন করাই রাষ্ট্রের প্রধান উদ্দেশ্য। অপরদিকে অন্যান্য সংঘগুলি নির্দিষ্ট কিছু সীমাবদ্ধ উদ্দেশ্য নিয়ে গঠিত হয়।
6) সদস্য সংখ্যা : একটি রাষ্ট্রের সদস্য সংখ্যা অন্যান্য সংঘের থেকে বহুগুণ বেশি। এ ব্যাপারে অন্যান্য সংঘের সঙ্গে রাষ্ট্রের কোনাে তুলনাই হয় না।
7) স্থায়িত্ব সংক্রান্ত বিষয় : রাষ্ট্রের স্থায়িত্ব তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য। কিন্তু অন্যান্য সংঘের ক্ষেত্রে এ কথা প্রযােজ্য নয়। অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানই অস্থায়ী।
8) কার্যাবলি : রাষ্ট্রের কার্যাবলি অন্যান্য সংঘের তুলনায় ব্যাপক ও বহুমুখী। রাষ্ট্রের তুলনায় অনেক
সীমিত ও স্বল্প সংখ্যক উদ্দেশ্য নিয়ে অন্যান্য সংঘগুলি গঠিত হয়।
9) প্রতিষ্ঠান সৃষ্টি করা : রাষ্ট্র প্রয়ােজনানুসারে অন্যান্য সংঘ সৃষ্টি করতে পারে। যেমন—কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় প্রভৃতি। কিন্তু অন্যান্য সংঘ ইচ্ছে করলে রাষ্ট্র তৈরি করতে পারে না। পরিশেষে বলা যায়, রাষ্ট্র ও অন্যান্য সংঘের মধ্যে বৈসাদৃশ্য থাকা সত্ত্বেও, বাস্তবে রাষ্ট্র ও যে-কোনাে সামাজিক প্রতিষ্ঠান যে পরস্পরের পরিপূরক এ বিষয়ে কোনাে সন্দেহ নেই। কারণ সমাজবদ্ধ মানুষের সব রকম দাবি পূরণ করা রাষ্ট্রের একার পক্ষে সম্ভব নয়। যেমন—নৈতিকতার শিক্ষা, আধ্যাত্মিক দাবি পূরণ, জাতীয়তাবােধ জাগ্রত করা, বিভিন্ন সামাজিক বিষয়ে সংস্কারসাধন, স্বাস্থ্য সচেতনতার প্রসারসাধন প্রভৃতি সামাজিক সংঘগুলিই করে থাকে। এক্ষেত্রে রাষ্ট্র অন্যান্য সংঘগুলিকে তাদের কার্যসম্পাদনে সহযােগিতা করে থাকে। সুতরাং আমরা বলতে পারি যে, রাষ্ট্র ও অন্যান্য সংঘগুলি পরস্পর পরস্পরের পরিপূরক।
Tags
Political Science
