মহাকবি মধুসূদনের ‘মেঘনাদবধ কাব্য বাঙালির জাতীয় কাব্য এবং শ্রীমধুসূদনের সর্বোত্তম সৃষ্টি। রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, “মাইকেল এমন একটি পথ খুলেছিলেন, যে পথে কেবলমাত্র তাঁরই একটিমাত্র মহাকাব্যের রথ চলেছিল।” তিনি বাংলা সাহিত্যের প্রথম বিদ্রোহী কবি-পুরুষ, তাই তাঁর সৃজনী প্রতিভা প্রাচ্য বীণায় পাশ্চাত্য সুর-ঝংকার তুলে বিদ্বৎসমাজকে বিস্মিত করেছিল।
গল্প, উপন্যাস, নাটক, কাব্য-কবিতা ইত্যাদির সাহিত্য ক্ষেত্রে নামকরণ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। 'নামকরণ হল বিষয়বস্তুর অন্তঃপুরে প্রবেশের প্রধান ফটক। নামকরণের সার্থকতার ওপর নির্ভর করে বিষয়বস্তুর শিল্প সার্থকতা। তাই নামকরণ খুব সচেতনভাবে করা দরকার।
আমাদের পাঠ্য কাব্যাংশটি ‘মেঘনাদবধ কাব্যের ষষ্ঠ সর্গের অংশবিশেষ—‘বধো নাম ষষ্ঠঃ সর্গঃ'। সুতরাং কাব্যাংশটির নাম কবিকৃত নয়, মাননীয় সংকলকগণ করেছেন। এই নামের সার্থকতা বিচার করতে হবে। কাব্যাংশটি মূলত ইন্দ্রজিৎ ও বিভীষণের কথােপকথন নির্ভর। Noble fellow ইন্দ্রজিৎ Scoundrel Bivishan-কে ধিক্কার জানাচ্ছেন তাঁর কুলদ্রোহিতা, দেশদ্রোহিতা এবং ষড়যন্ত্রে লিপ্ত থাকার জন্য। বাইরের শত্রু রাম-লক্ষ্মণ কর্তৃক আক্রান্ত লঙ্কা, স্বদেশপ্রেমিক ত্রিভুবনজয়ী ককূরকুল গর্ব মেঘনাদ তাঁদের সমুচিত শিক্ষা দিতে চান কিন্তু স্বকুলত্যাগী, বিভীষণের দেশদ্রোহিতা তাঁকে মর্মাহত করেছে। এই অবস্থায় মর্মাহত মেঘনাদ খুল্লতাতের মধ্যে পুনরায় সারিত করতে চেয়েছেন জাতীয়তাবােধের গরিমা এবং আস্বাদ। যদিও তাঁর বক্তব্যের মধ্যে ছিল ভৎসনার সুর কিন্তু খুল্লতাতের কাছে তাঁর বক্তব্য রাখতে গিয়ে দেখিয়েছেন শিষ্টাচার ও সৌজন্যবােধ।
খুল্লতাতের বিরুদ্ধে মেঘনাদের প্রধান অভিযােগ হল—প্রথমত, তিনি ষড়যন্ত্রকারী কেন-না ‘চণ্ডলসম লক্ষ্মণকে নিকুম্ভিলা যজ্ঞগৃহে প্রবেশ করতে সাহায্য করেছিলেন যাতে ভ্রাতুস্পুত্র নিহত হয়। দ্বিতীয়ত, অস্ত্রাগারের পথ রােধ করেছেন। তৃতীয়ত, কুলমর্যাদা ক্ষুন্ন করেছেন। চতুর্থত, বনবাসী, ঘৃণ্য, গৃহশত্রু রামচন্দ্রের দাসত্ব গ্রহণ করেছেন। পঞ্চমত, ‘বীরকুলগ্নানি’ রথীকুলপ্রথা লঙ্ঘনকারীকে নিজে রথীশ্রেষ্ঠ হয়েও সমর্থন করেছেন। ষষ্ঠত, জন্মভূমির অপমান সহ্য করেছেন। সপ্তমত, জাতিধর্ম, জ্ঞাতিধর্ম, ভ্রাতৃধর্ম এমনকি শাস্ত্রধর্মও মানেননি। কুসংসর্গে পড়ে কুশিক্ষা লাভ করেছেন।
পক্ষান্তরে আত্মপক্ষ সমর্থনে বিভীষণ দুটি কথা জানিয়েছেন। এক—তিনি রামচন্দ্রের দাস, দুই—“পরদোষে কে চাহে মজিতে'। এই দুটি কথা ‘গৃহশত্রু বিভীষণ’কে দেশদ্রোহিতার কলঙ্ক থেকে মুক্ত করতে পারেনি, বরং অবনত মস্তকে ভ্রাতুষ্পত্রের অভিযােগগুলি হজম করতে হয়েছে। সংকলকগণ বােধহয় এ ক্ষেত্রে পিতৃব্য ও ভ্রাতুস্পুত্রের কথােপকথনের মধ্যে ভ্রাতুস্পুত্রের বক্তব্যকেই অধিক গুরুত্ব দিয়েছেন। তা ছাড়া দেশাত্মবােধ, জাতীয়তাবােধ, সৌজন্যবােধসম্পন্ন ও পৌরুষত্বে প্রােজ্জ্বল একটি যুবক যেভাবে দেশদ্রোহী, বংশদ্রোহী খুল্লতাতের মধ্যে কুল-গৌরব-সৌরভ ও জাতীয়তাবােধের সঞ্চার ঘটাতে চেয়েছেন তাতে তাঁর বীরত্ব, ব্যক্তিত্ব ও দেশপ্রেম দেদীপ্যমান। এসব বিচার করে বলা যায় নামকরণ যথার্থ।
Tags
Bengali
