ইন্দ্রজিৎ চরিত্র সৃষ্টির ক্ষেত্রে কবির নিজস্ব একটি দুর্বলতা ছিল, এখানে আছে কবি জীবনের ব্যর্থতার হাহাকার।
“মেঘনাদবধ কাব্যের কেন্দ্রীয় চরিত্র—দেব-দৈত্য-নর-ত্রাস, করকুলের গর্ব, বাসববিজয়ী মেঘনাদের পৌরুষত্বের সুউচ্চশৃঙ্গ এবং ব্যর্থতার বেদনা ভরা গভীরতম স্বাদ সম্পৰ্ণরূপে এই কাব্যাংশে ধরা পড়ার কথা নয়। এ ক্ষেত্রেও আমাদের বিন্দুতে সিন্ধু দর্শন করতে হবে। তবে মনে রাখতে হবে, পৌরুষদর্পী ইন্দ্রজিৎ পৌরুষদর্পী মধুসূদনের মানস-সন্তান।
‘মেঘনাদবধ কাব্যে ষষ্ঠ সর্গেই মেঘনাদের শ্রেষ্ঠ গুণগুলির পূর্ণ বিকাশ ঘটেছে। এই সর্গে গােড়ায় কবি বলেছেন—ইন্দ্রজিৎ ‘নিমগ্ন তপে চন্দ্রচূড় যেন যােগীন্দ্র—অর্থাৎ রথীন্দ্রের যােগীন্দ্ররূপ, আমাদের পাঠ্য ৫১৭ছত্র থেকে ৫৯১ছত্র পর্যন্ত। এই সামান্য অংশ হওয়া সত্ত্বেও কবির লীলা তুলিকায় অঙ্কিত হয়েছে মেঘনাদ চরিত্রের মৌল বৈশিষ্ট্যগুলি। তিনি দেশাত্মবােধ ও জাতীয়তাবােধে উদ্দীপিত অসামান্য বীর, সৌজন্যবােধসম্পন্ন কুল-গৌরব, বিনয় নম্রতা, গুরুজনের প্রতি সম্মান প্রদর্শন, ধর্মাধর্ম বিচারে সহনশীলতা তাঁর চরিত্রকে উজ্জ্বল করেছে। এককথায় বীর্যে, দেশপ্রেমে, সৌজন্যবােধে, আত্মশক্তি নির্ভরতায়, দেশদ্রোহী ও কুলদ্রোহীর প্রতি ঘৃণা প্রদর্শনে মেঘনাদ চরিত্রটি অসাধারণ হয়ে উঠেছে—যেন যােগীশ্রেষ্ঠ আবার রথীশ্রেষ্ঠ।
তবে তিনি মানুষ তাে বটেই, স্বাধীনতা তাঁর হৃদয় দুন্দুভি। বিভীষণের দেশদ্রোহিতায় ক্রুদ্ধ হয়ে খুল্লতাতের মধ্যে সঞ্চারিত করতে চেয়েছেন জাতীয়তাবােধের অগ্নিশিখা। গুরুজনের কাছে সৌজন্যবশত আপন অজ্ঞতা স্বীকার করে বলেন ‘ বিজ্ঞতম তুমি'। ইন্দ্রজিৎ ধর্মবােধেও উজ্জ্বল। ইন্দ্রজিৎ ধার্মিক বিভীষণের কাছে জানতে চান জ্ঞাতিত্ব, ভ্রাতৃত্ব, জলাঞ্জলি দেওয়া কোন্ শাস্ত্রবিধি সম্মত ? মেঘনাদ একটি ধ্রুপদী চরিত্র, তার কাব্যকাননের সর্বোত্তম সৃষ্টি।
Tags
Bengali
