গােবিন্দদাসকে ‘বিদ্যাপতির ভাবশিষ্য’ বলা হয় কেন?

উত্তরঃ   
গােবিন্দদাসকে বিদ্যাপতির ভাবশিষ্য বলার কারণ : চৈতন্যপরবর্তী যুগের বাঙালি বৈষ্ণব কবি গােবিন্দদাস কবিরাজ বিদ্যাপতির ভাবশিষ্যরূপে পরিচিত। বল্লভদাস গােবিন্দদাস বন্দনায় তাঁকে দ্বিতীয় বিদ্যাপতি বলেছেন। গােবিন্দদাস ছিলেন বিদ্যাপতির পদের অনুরাগী। তিনি লিখেছেন—

“বিদ্যাপতি-পদ     যুগল সরােরুহ 
         নিস্যন্দিত মকরন্দে। 
তঝুমঝুমানস         মাতল মধুকর 
         পিবইতে কর অনুবন্ধে।”

বিদ্যাপতির সঙ্গে গােবিন্দদাসের কবিস্বভাবের সাদৃশ্য থাকায় গােবিন্দদাস বিদ্যাপতিকে নানাভাবে অনুসরণ করেছেন। বিদ্যাপতি-পদাবলির ব্যবহৃত ভাষা ব্রজবুলিকে অন্যতম মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করেছেন গােবিন্দদাস। ব্রজবুলি হল—মৈথিলি, হিন্দি ও বাংলা ভাষার মিশ্রণে সৃষ্ট কৃত্রিম সাহিত্যিক ভাষা। তিনি বাংলা ও ব্রজবুলি উভয় ভাষায় | পদ রচনা করলেও ব্রজবুলিতে রচিত পদের সংখ্যাই বেশি এবং মানের বিচারেও উৎকৃষ্ট। বিদ্যাপতির ভঙ্গি, পদবিন্যাসের কৌশল, অলংকারের প্রয়ােগ প্রভৃতি ক্ষেত্রে গােবিন্দদাস তাঁকে অনুসরণ করেছেন। তাই নয়, রাধিকার ভাবমূর্তি অঙ্কনের ক্ষেত্রেও উভয়ের মধ্যে অনেক সাদৃশ্য লক্ষ করা যায়। বিদ্যাপতির অনুসরণ করে গােবিন্দদাস তাঁর রাধাকে গড়েছেন ‘নাগরিকা চতুরিকা কলাবতী’ নায়িকারূপে। বিদ্যাপতির রচনার শুধু আদর্শ একটি পদে আছে—

“যাহা যাহা পদযুগ ধরই। 
তহা তহা সরােরুহ ভরই।। 
যাঁহা যাঁহা ঝলকত অঙ্গ।
হি হি বিজুরী তরঙ্গ।।” 

গােবিন্দদাসের রচনায় যেন এই পদেরই প্রতিধ্বনি শােনা যায়—

“যাহা যাহা নিকসয়ে তনু তনু জ্যোতি। 
তাহা তাহা বিজুরী চমকময় হােতি।। 
যাঁহা যাঁহা অরুণ-চরণ চল চলই।
তাহা তাহা থলকমলদল খলই।।” 

বিদ্যাপতির মতাে গােবিন্দদাসও ছিলেন সচেতন শিল্পী। কাব্যসৌন্দর্য নির্মাণের ক্ষেত্রে তিনিও বিদ্যাপতির মতাে সমান মনােযােগী। শব্দে, ছন্দে, কাব্যভাষার অন্তর্লীন সুষমায় বিদ্যাপতির রচনা যেভাবে অপরূপ হয়ে উঠেছে গােবিন্দদাসের রচনাতেও তার সাক্ষাৎ পাই। এইসব কারণেই গােবিন্দদাসকে ‘বিদ্যাপতির ভাবশিষ্য’ বলা হয়ে থাকে। কেউ কেউ আবার তাঁকে বলেন ‘ দ্বিতীয় বিদ্যাপতি।

Post a Comment

0 Comments