উত্তরঃ
● বিদ্যাপতির জীবন-পরিচয়: বিদ্যাপতির ব্যক্তিগত পরিচয় সম্পর্কে তাঁর লেখা বিভিন্ন গ্রন্থ এবং সমসাময়িক কিছু রচনা থেকে নিশ্চিতভাবে যেটুকু জানা যায়, তা হল—তিনি বিহারের দ্বারভাঙা জেলার মধুবনী পরগনার অন্তর্গত বিস্ফী গ্রামে এক ব্রাত্মণ বংশে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম গণপতি ঠাকুর। বিদ্যাপতি সংস্কৃত, মৈথিলি, অবহট্ঠ প্রভৃতি ভাষায় গ্রন্থ রচনা করেছেন। তাঁর ধর্মবিশ্বাসের বিষয়টি সংশয়াচ্ছন্ন, তবে প্রচলিত মত অনুযায়ী তিনি শৈব ছিলেন। পাঁচজন মিথিলারাজের পৃষ্ঠপােষকতা লাভ করেছিলেন এই দীর্ঘজীবী রাজকবি। ১৪৫০ থেকে ১৪৭৭ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে কোনাে এক সময়ে তিনি পরলােকগমন করেন।
● বিদ্যাপতির কবিপ্রতিভা : বিদ্যাপতি ছিলেন বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী; তবে বাংলা সাহিত্যে তাকে গ্রহণ করা হয়েছে তাঁর রাধাকৃয়-বিষয়ক অসাধারণ পদগুলির জন্যই। শৈব হয়েও বিদ্যাপতি রাধাকৃয়-বিষয়ক পদাবলি রচনা করতে গিয়ে আশ্চর্য দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন।
বয়ঃসন্ধি, করেছেন। তাঁর রচনায় বিভিন্ন রূপ। তাতে অভিসার, মিলন, মান, মাথুর ও ভাবসম্মিলনের পদে নানাভাবে রাধাকে তিনি উপস্থাপিত মনস্তাত্ত্বিক উপলদ্ধির সঙ্গে শিল্পনৈপুণ্যের সার্থক মিশ্রণে অঙ্কিত হয়েছে প্রেমিকা রাধার চৈতন্যপরবর্তী বৈয়বভক্তির প্রগাঢ়তা না থাকলেও জীবনসংলগ্ন শিল্পরসের প্রাচুর্য আছে ----
“যব গােধূলি সময় বেলিধনি মন্দির বাহির ভেলি।নব জলধর বিজুরি-রেহাদন্দ পসারি গেলি৷”
বিদ্যাপতির রচনায় 'নব অনুরাগিণী রাধা’র বাধা না-মানা অভিসার যাত্রার কথা আছে, আছে মিলনের আশ্চর্য যুগ অনুভব—“লাখ লাখ হিয়ে হিয়ে রাখলু/তবু হিয়া জুড়ন না গেল। আবার যখন তিনি দুঃখের বর্ণনা দেন তখন দিগবিদিকে ছড়িয়ে পড়ে বুকফাটা কাতরতা -----
“এ সখি হমারি দুখ নাহি ওর।এ ভরা বাদর মাহ ভাদরশূন্য মন্দির মাের।”
বিদ্যাপতির আঙ্গিক সচেতনতাও বিশেষভাবে লক্ষ করবার মতাে। তার শব্দচয়ন প্রায় ত্রুটিহীন, ছন্দজ্ঞান তীক্ষ; অলংকার প্রয়ােগে তিনি সিদ্ধহস্ত; উপমা, অতিশয়ােক্তি ইত্যাদি প্রয়ােগেও বিদ্যাপতি সফল।
প্রত্নকলাবৃত্ত রীতির ছন্দে রচিত তার বিভিন্ন পদে বিভিন্ন ধরনের ছন্দবন্ধ ব্যবহৃত হয়েছে। একপদী, দ্বিপদী, ত্রিপদী ও চৌপদী বন্ধে রচিত পদগুলিতে বিভিন্ন আয়তনের পর্বের ব্যবহার তাঁর রচনাকে বৈচিত্র্যমণ্ডিত করে তুলেছে—ছন্দে, অলংকারে, ধ্বনিঝংকারে তাঁর পদাবলি অপরূপতা লাভ করেছে।

0 Comments
Please Do Not Enter Any Span Link in The Comment Box