উত্তরঃ
বৈষ্ণব পদাবলির প্রধান চারজন কবি হলেন—বিদ্যাপতি, জ্ঞানদাস, চণ্ডীদাস ও গােবিন্দদাস।
● জ্ঞানদাসের কবিপ্রতিভা : চৈতন্যোত্তর পর্বের বৈয়ব পদাবলির তান্যতম প্রধান পদকর্তা হলেন ভনদাস। জ্ঞানদাস বাংলা এবং ব্রজবুলি উভয় ভাষাতেই পদ রচনা করলেও ব্রজবুলি অপেক্ষা বাংলা রচনাতেই তাঁর অধিকতর সার্থকতা। চণ্ডীদাসের মতােই তাঁর পদে সহজ সরল ভঙ্গিতে গভীর ভাব প্রকাশিত হয়েছে ; কোনাে কোনাে ক্ষেত্রে পূর্ববর্ত কবি চণ্ডীদাসের সঙ্গে তাঁর রচনাগত সাদৃশ্যও লক্ষ করা যায়। এই কারণে জ্ঞানদাসকে চণ্ডীদাসের ভাবশিষ্য' বলা হয়ে থাকে।
জ্ঞানদাস বিভিন্ন বিষয় অবলম্বনে পদ রচনা করেছেন। তবে পূর্বরাগ, আক্ষেপানুরাগ ও নিবেদন পর্যায়ের পদেই তাঁর প্রতিভার যথার্থ বিকাশ। জ্ঞানদাসের পদে ভক্তি এবং শিল্পবােধের আশ্চর্য সমন্বয় লক্ষ করা যায়। তিনি একই সঙ্গে ভক্ত ও শিল্পী। নায়ক-নায়িকার রূপবর্ণনায়, প্রেমাবেগের তীব্র আকুলতা প্রকাশে তাঁর রচনা শিল্পমণ্ডিত হয়ে উঠেছে। তার রাধা চণ্ডীদাসের রাধার মতাে আত্মবিস্মৃতা নন, বরং অনেক বেশি রূপসচেতন নারী। তার রাধা বলেন ----
“রূপ লাগি আঁখি ঝুরে গুণে মন ভাের।প্রতি অঙ্গ লাগি কান্দে প্রতি অঙ্গা মাের।।হিয়ার পরশ লাগি হিয়া মাের কান্দে।পরান পিরীতি লাগি থির নাহি বাধে।।”
আবার কখনও বা বলেন ----
“রূপের পাথারে আঁখি ডুবি সে রহিল।যৌবনের বনে মন হারাইয়া গেল।।”
জ্ঞানদাসের পদে এভাবেই ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য প্রেমের অনুভব প্রকাশিত হয়। বৈব দর্শন অনুযায়ী অলৌকিক দেহাতীত প্রেমরূপে বিবেচনা করতে হবে, তবু এই ধরনের পদে লৌকিক চেতনা আক্ষেপানুরাগের পদে প্রেমিকা রাধার অনুতাপজৰ্জর হৃদয়ের যে পরিচয় জ্ঞানদাস তুলনাহীন -----
“সুখের লাগিয়া এ ঘর বাধিনঅনলে পুড়িয়া গেল।অমিয়া-সাগরে। সিনান করিতেসকলি গরল ভেল।।”
ভাব ও রূপের সমন্বয়প্রয়াসী জ্ঞানদাসের পদে রাধাকৃষ্ণের প্রেমের বিষয়টি এমনভাবে পরিবেশিত হয়েছে যে, একালের পাঠকের দৃষ্টিতে অনেক সময় তা রােমান্টিক বলে মনে হয়। যেমন একটি পদে আছে ------
“রজনী শাঙন ঘন ঘন দেয়া গরজনরিমিঝিমি শবদে বরিষে।পালকে শয়ান রগে বিগলিত চীর অঙ্গেনিন্দ যাই মনের হরিষে।।”
এভাবেই জ্ঞানদাসের পদে রাধাকৃয়লীলাকে অবলম্বন করে বিকশিত হয়ে উঠেছে কবিত্ব। ভক্তি বা গৌড়ীয় বৈষ্ণব দর্শনের অনুশাসন তাঁর কবি-স্বভাবকে ক্ষুন্ন করতে পারেনি।

0 Comments
Please Do Not Enter Any Span Link in The Comment Box