উত্তরঃ
● গােবিন্দদাসের কবিপ্রতিভা : গােবিন্দদাস কবিরাজ বৈষ্ণব পদাবলি সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি। ষোড়শ শতাব্দীর চতুর্থ দশকে বর্ধমান জেলার শ্রীখণ্ডগ্রামে তার জন্ম। কথিত আছে, তিনি প্রথম জীবনে শাক্ত ছিলেন । পরে শ্রীনিবাস আচার্যের কাছে তিনি বৈষ্ণবধর্মে দীক্ষা গ্রহণ করেন। গােবিন্দদাস কবিরাজের পদাবলিতে গভীর ভক্তির সঙ্গে অসাধারণ শিল্পনৈপুণ্যের আশ্চর্য সমন্বয় ঘটেছে। প্রকৃতপক্ষে বাংলাদেশে ব্রজবুলি পদরচনার ব্যাপক প্রচলন ঘটে গােবিন্দদাসের মাধ্যমেই।
গােবিন্দদাসের পদাবলি আস্বাদন করতে গিয়ে প্রথমেই দৃষ্টি আকর্ষণ করে তাঁর গৌরচন্দ্রিকার পদগুলি। মহাপ্রভু শ্রীচৈতন্যদেবের ভাবময় জীবনকে তিনি চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন তার গৌরচন্দ্রিকা পর্যায়ের পদে -----
“নীরদ নয়নে নীরঘন সিনেপুলক-মুকুল-অবলম্ব।স্বেদ মকরন্দ। বিন্দু বিন্দু চুয়তবিকশিত ভাবকদম্ব।।”
পূর্বরাগ পর্যায়ের পদেও গােবিন্দদাস সার্থক -----
“যাঁহা যাঁহা নিকসয়ে তনু তন জ্যোতি।তাহা তাহা বিজুরী চমকময় হােতি।।যাঁহা যাঁহা অরুণ-চরণ চল চলই।তাহা তাহা থলকমল-দল খলই।।”
এরকম বিভিন্ন পর্যায়ের পদে তাঁর কৃতিত্ব দেখা গেলেও গােবিন্দদাসের শ্রেষ্ঠত্বের মূল ক্ষেত্রটি হল অভিসার। গােবিন্দদাসের অভিসারিকা রাধার মধ্যে যে দুর্বার কৃষ্ণমুখীনতা লক্ষ করা যায় তার তুলনা নেই। অভিসার যাত্রার পূর্বে রাধার প্রস্তুতিপর্ব বর্ণনাতেও আছে সুকঠিন কৃচ্ছসাধনার পরিচয় ----
“কণ্টক গাড়ি কমলসম পদতলমঞ্জির চীরহি ঝাপি।গাগরিবারি ঢারি করি পথ পীছলচলতহি অগুলি চাপি।”
হৃদয়ের গভীর অনুভূতি আর সৌন্দর্যচেতনার সার্থক সমবায়ে গােবিন্দদাসের পদ উৎকৃষ্ট কাব্যের স্তরে উন্নীত। বাগর্থ-মিলনের রহস্য তিনি জানতেন। শব্দচয়নে, ছন্দের বিন্যাসে কিংবা অলংকারের প্রয়ােগেও তাঁর নৈপুণ্য চোখে পড়ার মতাে। নিজের রচনা সম্পর্কে গােবিন্দদাস বলেছেন -----
“রসনা রােচন শ্রবণ-বিলাস।রচই রুচির পদ গােবিন্দদাস।।”
এই আত্মমূল্যায়ন যথার্থ বলেই মনে হয়।

0 Comments
Please Do Not Enter Any Span Link in The Comment Box