উত্তরঃ
● বাংলা ভাষায় ভাগবত অনুবাদের ধারা : সংস্কৃত ভাষায় রচিত ‘শ্রীমদ্ভাগবত পুরাণ’ সাধারণভাবে ভাগবত’ নামে পরিচিত। ভাগবত হল আঠারােটি পুরাণের মধ্যে অন্যতম ; এটি রচনা করেন মহর্ষি বেদব্যাস। সংস্কৃত ভাষায় রচিত এই পুরাণ বারােটি স্কন্ধ বা অধ্যায়ে বিভক্ত। দার্শনিক তত্ত্বপূর্ণ স্তবস্তুতি ও বিবিধ ভক্তিমূলক আখ্যানে সমৃদ্ধ গ্রন্থটিতে চমৎকারভাবে পরিবেশিত হয়েছে শ্রীকৃষ্ণের জীবনকথা।
সংস্কৃত 'রামায়ণ' ও 'মহাভারত' অবলম্বনে বাংলায় কাব্য রচনার যেমন একটি ধারা তৈরি হয়েছিল তেমনি সংস্কৃত ভাগবত অবলম্বনেও বাংলায় কাব্য রচনার প্রয়াস দেখা যায়। বাংলায় এই ভাগবতচর্চার সূচনা চৈতন্যপূর্ব যুগে এবং এর বিস্তার চৈতন্য-পরবর্তী যুগে।
সংস্কৃত ভাগবতপুরাণ অবলম্বনে বাংলায় প্রথম কাব্য রচনা করেন মালাধর বসু বা গুণরাজ খান, যিনি ছিলেন চৈতন্যপূর্বযুগের কবি। মালাধর বসু তাঁর কাব্যের নাম দিয়েছিলেন শ্রীকৃয়বিজয়’ ; তবে এই কাব্যের কোনাে কোনাে পুথিতে ‘গােবিন্দবিজয়’ বা ‘গােবিন্দমঙ্গল' নামও পাওয়া যায়। এই কাব্যটি ১৪৭৩ থেকে ১৪৮০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে রচিত হয়। মালাধর বসু ভাগবতের কেবল দশম ও একাদশ স্কন্ধ অবলম্বনে শ্রীকৃয়বিজয় রচনা করেছেন। তাঁর কাব্যে ভাগবতের তত্ত্বগত দিকটি কিছুটা খর্ব হয়েছে ; তিনি কাহিনির ওপরেই জোর দিয়েছেন বেশি। তিনি কৃষকথা বর্ণনা করেছেন বাঙালির জীবন-স্বভাবের সঙ্গে সংগতি রেখে। স্বয়ং চৈতন্যদেব এই কাব্যটির খুব প্রশংসা করতেন ; বৈয়ব সমাজেও মালাধর বসুর ‘শ্রীকৃষ্ণবিজয় বিশেষ সমাদরের বস্তু।
চৈতন্যোত্তর যুগের ‘ভাগবত’ অনুবাদের ধারায় একটি উল্লেখযােগ্য কাব্য হল দ্বিজমাধবের ‘শ্রীকৃয়মঙ্গল। তাঁর কাব্যে ‘ভাগবত’ ছাড়াও হরিবংশ', 'মহাভারত', ' বিয়ুপুরাণ' প্রভৃতি গ্রন্থ থেকে বিভিন্ন কাহিনি গৃহীত হয়েছে। শুধু তাই নয়, দ্বিজমাধব তাঁর কাব্যে নৌকালীলা, দানলীলা প্রভৃতি লৌকিক কাহিনিকে যেমন গ্রহণ করেছেন তেমনি কৃয়ের পাশে তিনি উপস্থাপিত করেছেন ভাগবত-বহির্ভূতা রাধাকেও। শ্রীকৃয়মঙ্গল’ মধুর রসে সিক্ত, এতে পাণ্ডিত্য অপেক্ষা প্রাধান্য পেয়েছে ভাবোচ্ছ্বাস।
বাংলায় ‘ভাগবত’-অনুবাদের ধারায় আরও অনেক কবির নাম পাওয়া যায়। তাদের মধ্যে উল্লেখযােগ্য কয়েকজন হলেন—কৃয়দাস, কবিশেখর দৈবকীনন্দন, দ্বিজ পরশুরাম, বলরাম দাস প্রমুখ। ভাগবত’কে সামনে রেখে এইসব কবিরা রাধাকৃষকথাই পরিবেশন করতে চেয়েছেন।

0 Comments
Please Do Not Enter Any Span Link in The Comment Box