কৃত্তিবাস কার কোন্ কাব্যের অনুবাদ করেছিলেন? তাঁর অনূদিত কাব্যটির জনপ্রিয়তার কারণ আলােচনা করাে।

উত্তরঃ কৃত্তিবাস বাল্মীকির রামায়ণ-এর বাংলা অনুবাদ করেছিলেন, অনূদিত গ্রন্থের নাম ছিল শ্রীরাম পাঁচালী'।

কৃত্তিবাসী রামায়ণের জনপ্রিয়তার কারণ : কৃত্তিবাসের রামায়ণ’ বা ‘শ্রীরাম পাঁচালী' বাঙালির পরম সমাদরের বস্তু। সামাজিক বহু পরিবর্তন এবং অনেক রাজনৈতিক উত্থানপতনের মধ্যেও আপামর বাঙালির কাছে কৃত্তিবাসী রামায়ণ চর্চার ঐতিহ্য অব্যাহত থেকেছে। বাঙালি-জীবনে কৃত্তিবাসী রামায়ণ’-এর এই বহু শতাব্দীব্যাপী জনপ্রিয়তার কারণগুলি হল—

১) বাল্মীকি ’-এর কাহিনিকে হুবহু অনুসরণ করেননি, তিনি মূল রামায়ণ’-এর কাহিনির সঙ্গে অন্য কাহিনিও যুক্ত করেছেন ; কোনাে কোনাে ক্ষেত্রে তার নিজস্ব সংযােজনও আছে। সব মিলিয়ে এই কাব্যটিতে যে কাহিনিবৃত্ত গড়ে উঠেছে তা বাঙালি মানসিকতার অনুকূল। 

২) কৃত্তিবাসের কাব্যে সংস্কৃত রামায়ণ’-এর ক্ষত্রিয় বীর রামচন্দ্র হয়ে উঠেছেন ভক্তের ভগবান, সীতা পরিণত হয়েছেন সহনশীলা বাঙালি কুলবধূতে। ভরত ও লক্ষ্মণের মধ্যে অনুগত বাঙালি ভাইকে খুঁজে পাওয়া যায়, হনুমান যেন প্রভুভক্ত শক্তিশালী পুরাতন ভৃত্য। কৃত্তিবাসী রামায়ণের চরিত্রগুলির মধ্যে বাঙালি স্বভাবের দেখা পাওয়া যায় বলে বাংলার মানুষ খুব সহজেই এই চরিত্রগুলির সঙ্গে একাত্মতা স্থাপন করতে পারে।

৩) কাব্যটির মধ্যে নানাভাবে বাংলার পরিবেশ এবং বাঙালির প্রাত্যহিক পারিবারিক জীবন উপস্থাপিত হওয়ায় বাঙালি-মনকে তা খুব সহজেই আকর্ষণ করে। নারকেল, সুপারি, কাক, কাদাখোঁচা, সারস ঘেরা প্রকৃতি যেমন কৃত্তিবাসের রামায়ণে আছে, তেমনই আছে বাঙালির সমাজজীবনের অন্তরঙ্গ ছবি। সেখানে ষষ্ঠীপূজা, অন্নপ্রাশন ইত্যাদি সামাজিক রীতি যেমন আছে, তেমনই সীতার মধ্যে লজ্জাশীলা বাঙালি কুলবধূ বা লক্ষ্মণের সঙ্গে রসিকতায় দেওর-বউদির সম্পর্কের চিরকালীনতা প্রকাশ পেয়েছে। 

৪) ভক্তি এবং করুণরস, এ দুটির প্রতিই বাঙালির আকর্ষণ চিরকালের। এই ভক্তিবাদ এবং করুণরস প্রবণতার জন্য কৃত্তিবাসী রামায়ণ’ বাঙালির কাছে আরও বেশি গ্রহণীয় হয়ে উঠেছে।

৫) কৃত্তিবাস সাধারণ মানুষের উপযােগী করে পাঁচালির ঢঙে রামায়ণ-কথা পরিবেশন করেছিলেন বলে বাঙালি জনসাধারণ কৃত্তিবাসী রামায়ণকে অবলম্বন করে কাহিনির রসাস্বাদন যেমন করতে চেয়েছে, তেমনি পেয়েছে পুণ্য অর্জনের একটি সহজ সুযােগও।

Post a Comment

0 Comments