কৃত্তিবাসের কাব্যটি কোন্ সময়ে লেখা হয়? কবির কাব্যে বাঙালি জীবনের যে ছবি প্রকাশ পেয়েছে তার বিবরণ দাও।

উত্তরঃ 
রচনাকাল : কৃত্তিবাসের রামায়ণ' কাব্যের কোনাে পুথিতেই রচনাকালের উল্লেখ নেই। তবু বিভিন্ন সূত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে বলা যায়, সম্বত পঞ্চদশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে তার এই কাব্যটি রচিত হয়। 
বাঙালির জীবনালেখ্য হিসেবে রামায়ণ : কৃত্তিবাস বাল্মীকির রামায়ণ’-এর অনুসরণে তার শ্রীরাম স্ত্র পাঁচালী' রচনা করলেও বাল্মীকিকে পুরােপুরি অনুকরণ করেননি। কাহিনি, চরিত্র, পরিবেশ বর্ণনা প্রভৃতি ক্ষেত্রে তাঁর নিজস্ব সংযােজন ঘটেছে। সমগ্র কাব্যটিকে তিনি রচনা করেছেন একজন বাঙালি কবির দৃষ্টিকোণ থেকে।

কৃত্তিবাসের এই কাব্যে সেকালের খাদ্য, বেশভূষা, আচার-অনুষ্ঠান, রীতিনীতি প্রভৃতির পরিচয় আছে। গৃহকগৃহে ভরতকে আপ্যায়ন করা হয় দই, দুধ, নারকেল, আম, কলা প্রভৃতি দিয়ে। এ ছাড়া এই কাব্যের বিভিন্ন অংশে গুড়পিঠে, তালবড়া, ছানাবড়া, নারকেল-পুলি, খাজা, গজা, জিলিপি, পায়েস, পিঠে প্রভৃতি বাঙালি-খাবারের উল্লেখ পাওয়া যায়। উত্তরাকাণ্ডে সীতাদেবী লক্ষ্মণকে নিজের হাতে রান্না করে যা খেতে দিয়েছিলেন তা বাঙালির খাদ্যাভ্যাসেরই প্রকাশ ----

“প্রথমেতে শাক দিয়া ভােজন আরম্ভ। 
তাহার পরে সুপ আদি দিলেন সানন্দ।। 
ভাজা ঝােল আদি করি পঞ্চাশ ব্যঞ্জন। 
ক্রমে ক্রমে সবাকারে কৈল বিতরণ।। 
শেষে অম্বলান্তে হৈল ব্যঞ্জন সমাপ্ত। 
দধি পরে পরমান্ন পিষ্টকাদি যত।” 

সন্তানজন্মের পর পঞম দিনে পাঁচুটি’, ষষ্ঠ দিনে ষষ্ঠীপূজা’, অষ্টম দিনে ‘অষ্টকলাই’, ছয় প্রভৃতির বিবরণ একান্তভাবেই বাঙালি জীবনের পরিচয়বাহী। বাঙালি সমাজে প্রচলিত নিয়ম হয়েছে দশরথের ‘অগ্নিকার্য’, ‘আদ্যশ্রাদ্ধ’ প্রভৃতি। কৃত্তিবাসী রামায়ণ’-এর চরিত্রগুলির মধ্যে অত্যন্ত স্পষ্ট। রামচন্দ্র এখানে মহাকাব্যের ক্ষত্রিয় বীর অপেক্ষা অনেক বেশি বাঙালি সন্তান; মধ্যে সঞ্চারিত হয়েছে বাঙালি ভাইয়ের ধর্ম, সীতাকে মনে হয় এক দুর্ভাগিনী বাঙালি গৃহবধূ। পতিপরায়ণতা, পিতৃভক্তি, সেবাপরায়ণতার সঙ্গে আলস্য, কলহপ্রিয়তা,  ভােগবিলাস প্রভৃতিও
মাসে ‘অন্নপ্রাশন’ অনুসারেই অনুষ্ঠিত বাঙালি-জীবনস্বভাব ভরত, লক্ষ্ণন-এর বাঙালির ভ্রাতৃপ্রেম, এখানে বর্ণিত হয়েছে। প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত বাঙালিয়ানায় ভরপুর এই কাব্য সম্পর্কে অসিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় যথার্থ বলেছেন—“কৃত্তিবাসের কল্পনা বাঙালির আটচালা আর পঁচিশের বন্দ’ ঘরের উপরে উঠিতে পারে নাই। সমস্ত বাঙালির মনােভাবের অনুকূল এবং অভিজ্ঞতার অন্তর্ভুক্ত ঘরােয়া বর্ণনায় কৃত্তিবাসের কল্পনার বন্ধনহীন উৎকেন্দ্রিকতা প্রকাশ পায়।”

Post a Comment

0 Comments